ইরান আমেরিকা ইজরায়েল যুদ্ধ বিরতিতে পাকিস্তানের কূটনীতি আর ভারতের কৌশলগত নীরবতা

ইরান আমেরিকা ইজরায়েল যুদ্ধ বিরতিতে পাকিস্তানের কূটনীতি আর ভারতের কৌশলগত নীরবতা

ইরান, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের মধ্যে চলা দীর্ঘ ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরুর সংকেত মিলতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বস্তির জোয়ার এসেছে, চাঙ্গা হয়েছে শেয়ারবাজার। তবে এই যুদ্ধ বিরতির নেপথ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের নাটকীয় উত্থান এবং ভারতের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কেন মধ্যস্থতায় এগিয়ে এল পাকিস্তান

আমেরিকা ও ইরান—উভয় পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখে পাকিস্তান এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সক্রিয় তৎপরতা এই শান্তি প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি।

  • ভৌগোলিক ও ধর্মীয় নৈকট্য: ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া ইরানের পর পাকিস্তানই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া প্রধান দেশ, যা তেহরানের সঙ্গে ইসলামাবাদের একটি মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র তৈরি করেছে।
  • আসিম মুনিরের ভূমিকা: পাক সেনাপ্রধান নিজে উদ্যোগী হয়ে গত রবিবার রাতে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে শান্তি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেন। সামান্য রদবদলের পর উভয় দেশ এই প্রস্তাবে সায় দেয়।
  • মার্কিন সমর্থন: ট্রাম্প প্রশাসন যখন ন্যাটোর মিত্রদের সমর্থন পাচ্ছিল না এবং ইউরোপের দেশগুলো যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকার করছিল, তখন পাকিস্তানকেই নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন হিসেবে বেছে নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল ও ভারতের অবস্থান

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন ভারতকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানকে গুরুত্ব দিলেন, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল হতে পারে।

  • ইজরায়েলকে রাজি করানো: ইজরায়েল প্রথমে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা মানতে নারাজ থাকলেও ট্রাম্প ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে তাদের রাজি করান।
  • নয়াদিল্লির নীরবতা: নরেন্দ্র মোদী এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও ভারত কেন সক্রিয় হলো না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, বিশ্বশান্তি রক্ষায় ভারতের যে ঐতিহ্যগত ভূমিকা, তা পালনে সরকার পিছিয়ে ছিল।

ভারতের নিষ্ক্রিয়তার নেপথ্য কারণ

ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এবং কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ভারতের এই অবস্থানকে ‘কৌশলগত নীরবতা’ হিসেবে দেখছেন।

  • ঝুঁকি এড়ানো: আমেরিকা এবং ইজরায়েল উভয়ের সাথেই ভারতের ঘনিষ্ঠতা গভীর। অন্যদিকে ইরানের সাথেও সুসম্পর্ক জরুরি। এই পরিস্থিতিতে কোনো এক পক্ষের হয়ে মধ্যস্থতা করা দিল্লির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারত।
  • জ্বালানি নিরাপত্তা: ভারত মূলত পর্দার আড়ালের কূটনীতি এবং নিজস্ব জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত ছিল। হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল দিল্লির প্রধান লক্ষ্য, যাতে ভারত সফল হয়েছে।
  • হস্তক্ষেপ না করার নীতি: ভারত সাধারণত বিদেশি সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলতে চায়, যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় মোদীর ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যুদ্ধের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ বৈঠক

স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে শুক্রবার ইসলামাবাদে ইরান এবং আমেরিকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চলেছেন। এই বৈঠকের সাফল্যই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালীর বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *