বেকারদের চাকরি থেকে সপ্তম পে কমিশন— বাংলার জন্য হলদিয়ার মঞ্চে মোদীর ৬ গ্যারান্টি

বৃহস্পতিবার ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ায় এক বিশাল জনসভায় যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সভা মঞ্চ থেকে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ করার পাশাপাশি একাধিক জনমুখী প্রতিশ্রুতি এবং ‘গ্যারান্টি’ দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সভার মাধ্যমে মোদী কেবল বিরোধী দলকে নিশানা করেননি, বরং কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের রোডম্যাপ তুলে ধরে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা: নন্দীগ্রামের প্রতিধ্বনি ভবানীপুরে
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই পরিবর্তনের ডাক দেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন পাঁচ বছর আগের বিধানসভা নির্বাচনের কথা। মোদীর দাবি, সেবার নন্দীগ্রাম যেভাবে পথ দেখিয়েছিল, এবার তার প্রতিফলন ঘটবে ভবানীপুরসহ গোটা বাংলায়। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর জয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বুঝিয়ে দেন, এবারও তাঁর অন্যতম প্রধান ভরসা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীই।
দুর্নীতি ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে সরাসরি আক্রমণ
রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলায় এখন ‘কাটমানি’ ও ‘সিন্ডিকেটের গুণ্ডারাজ’ চলছে। ফ্যাক্টরি চালাতে গেলেও এখানে কাটমানি দিতে হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। নারী সুরক্ষা নিয়ে তৃণমূল সরকারকে বিঁধে মোদী জানান, এই শাসনকালে রাজ্যের মেয়েরা নিরাপদ নন। এমনকি স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে ডাক্তার, আইনজীবী—কেউই সুরক্ষিত নন কারণ সরকার অপরাধীদের মদত দিচ্ছে।
হলদিয়ার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের আশ্বাস
একসময়ের শিল্পাঞ্চল হলদিয়ার বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগে মানুষ এখানে কাজ করতে আসতেন, আর এখন কর্মসংস্থানের অভাবে এখানকার মানুষকে ওড়িশা যেতে হচ্ছে।
- রোজগার মেলা: বিজেপি ক্ষমতায় এলে হলদিয়ায় নিয়মিত ‘রোজগার মেলা’ এবং স্বচ্ছভাবে চাকরির পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
- বন্দরের পুনরুজ্জীবন: প্রাচীন তাম্রলিপ্ত বন্দরের গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলদিয়া বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সার্বিক উন্নতির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মাছ রাজনীতি ও মৎস্যজীবীদের প্রত্যাশা
সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যে মাছ নিয়ে চলা বিতর্কের জবাব দেন মোদী। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূল সরকার মৎস্য উৎপাদনে কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয়নি, যার ফলে বাংলাকে অন্য রাজ্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে মৎস্য উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে এবং বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে এখানেও মৎস্য চাষে স্বনির্ভরতা আসবে।
হলদিয়া থেকে মোদীর ৬ ‘গ্যারান্টি’
নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে প্রধানমন্ত্রী এদিন রাজ্যবাসীর সামনে ছয়টি বিশেষ অঙ্গীকার বা ‘গ্যারান্টি’ তুলে ধরেন:
১. ভয়ের পরিবেশ দূর করে সাধারণ মানুষকে ভরসা দেওয়া।
২. সরকারি ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ করা।
৩. প্রতিটি ধর্ষণ ও দুর্নীতির ঘটনার পুরনো ফাইল খুলে পুনরায় তদন্ত শুরু করা।
৪. দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী ও নেতাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং জেলে পাঠানো।
৫. শরণার্থীদের নাগরিক অধিকার প্রদান এবং অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কার করা।
৬. রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘সপ্তম পে কমিশন’ কার্যকর করা।
প্রশাসনের প্রতি কড়া বার্তা
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, তৃণমূল সরকার ‘PM’ (প্রধানমন্ত্রী) শব্দটিকে ঘৃণা করে এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর নাম বদলে দেয়। তাঁর মতে, এটি সংবিধানের প্রতি অবমাননা। তিনি স্পষ্ট জানান, কেন্দ্রীয় প্রকল্পে দুর্নীতি করলে বা টাকা আত্মসাৎ করলে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।
একঝলকে মোদীর হলদিয়া সফর
- মূল লক্ষ্য: দুর্নীতি দমন, নারী সুরক্ষা এবং শিল্পায়ন।
- কর্মসংস্থান: হলদিয়ায় নিয়মিত রোজগার মেলা ও চাকরির পরীক্ষার প্রতিশ্রুতি।
- প্রশাসনিক সংস্কার: বিজেপি ক্ষমতায় এলে সপ্তম পে কমিশন চালুর আশ্বাস।
- অনুপ্রবেশ: অনুপ্রবেশকারীদের দেশছাড়া করার হুঁশিয়ারি ও শরণার্থীদের অধিকার প্রদান।
- মৎস্য শিল্প: মাছ উৎপাদনে বাংলাকে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা।