অশনিসংকেত! ইতিহাসের চতুর্থ উষ্ণতম, গরমের রেকর্ড গড়ল মার্চ

চলতি বছরের মার্চ মাস বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ সংকেত দিয়ে গেল। আবহাওয়াবিদদের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসটি পৃথিবীর ইতিহাসের চতুর্থ উষ্ণতম মার্চ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। ইউরোপীয় আবহাওয়া সংস্থা ‘কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস’ (সি-থ্রিএস)-এর তথ্য বলছে, শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা কেবল স্থলভাগেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি করেছে নতুন নতুন রেকর্ড।
ঘনিয়ে আসছে ‘সুপার এল নিনো’
ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ‘সুপার এল নিনো’ তৈরির প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবহাওয়া আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে। সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের জল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হলে তাকে ‘এল নিনো’ বলা হয়, যা বিশ্বজুড়ে খরা, অতিবৃষ্টি বা অস্বাভাবিক গরমের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রায় অস্থিরতা
চলতি বছরের মার্চে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ২০.৯৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ইতিহাসের পাতায় সমুদ্রকে এর চেয়ে বেশি উষ্ণ হতে দেখা গিয়েছে মাত্র একবার, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। সেই বছর সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সমুদ্রের এই ক্রমাগত উষ্ণায়ন সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান এবং বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মেরু অঞ্চলে বরফের রেকর্ড হ্রাস
আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলে সমুদ্রের বরফের বিস্তার এ বছর আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। তথ্য অনুযায়ী:
- ১৯৯১-২০২০ সালের গড় বিস্তারের তুলনায় এ বছর আর্কটিক অঞ্চলে বরফ ৫.৭ শতাংশ কম ছিল।
- দক্ষিণ মেরু বা অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলেও বরফের বিস্তার গড় হারের চেয়ে ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।সি-থ্রিএস-এর অধ্যক্ষ কারলো বুয়োনটেম্পোর মতে, সমুদ্রের রেকর্ড উষ্ণতা এবং বরফের সর্বনিম্ন পরিমাণ একযোগে প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিস্থিতি ক্রমশ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অঞ্চলভেদে তাপমাত্রার বৈচিত্র্য
মার্চ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আবহাওয়ার চরম রূপ দেখা গিয়েছে। পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং হিমালয় ও তিব্বত মালভূমি অঞ্চলে তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছে আলাস্কা, কানাডার অধিকাংশ অংশ এবং উত্তর-পশ্চিম সাইবেরিয়ায়, যেখানে ছিল অস্বাভাবিক ঠান্ডা। এই বৈপরীত্য মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলের অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ।
একঝলকে
- ২০২৬ সালের মার্চ মাসটি ইতিহাসের চতুর্থ উষ্ণতম মার্চ।
- গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ১.৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।
- সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ২০.৯৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
- আর্কটিক অঞ্চলে বরফের বিস্তার স্বাভাবিকের চেয়ে ৫.৭ শতাংশ কম।
- প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’, যা আগামীতে আরও চরম আবহাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।