১.২৫ লক্ষ টাকায় একটি ডিম! ৪০ দিনের যুদ্ধে ধ্বংসের মুখে ইরান, আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি

২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ ৪০ দিনের অস্থিরতা ও যুদ্ধের আবহে দেশটির অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে ইরানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এতটাই বেড়েছে যে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে চাল, ডাল ও দুধের মতো মৌলিক খাদ্যদ্রব্য। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রার মানের রেকর্ড পতন এই সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে।
আকাশছোঁয়া বাজারদর ও সাধারণ মানুষের হাহাকার
ইরানের স্থানীয় বাজারগুলোতে এখন পণ্যের দাম শুনলে যে কেউ চমকে উঠতে পারেন। মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একটি ডিম কিনতে গুণতে হচ্ছে সোয়া লাখ রিয়াল। জীবনযাত্রার এই অস্বাভাবিক ব্যয় ইরানি নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনকে পঙ্গু করে দিয়েছে। বাজারের বর্তমান চিত্র অনুযায়ী:
- দুধ ও ডিম: এক লিটার দুধের দাম দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ রিয়ালে। অন্যদিকে, এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল দামে।
- প্রধান খাদ্য: সাধারণ মানুষের প্রধান খাদ্য চালের দাম প্রতি কেজিতে ৩২ লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে।
- মাংস: আমিষের চাহিদা মেটানো এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। এক কেজি মাংসের দাম বর্তমানে এক কোটি রিয়াল স্পর্শ করেছে।
মুদ্রার রেকর্ড পতন ও ডলারের বিপরীতে রিয়ালের অবস্থা
ইরানের জাতীয় মুদ্রা ‘রিয়াল’ এখন মূল্যহীন কাগজে পরিণত হওয়ার পথে। খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজার রিয়াল। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় রিয়ালের মান তলানিতে ঠেকেছে। ভারতীয় মুদ্রার সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ভারতের মাত্র ১ রুপি বর্তমানে প্রায় ১৭,২০০ ইরানি রিয়ালের সমান। সরকারি হিসাব ও খোলা বাজারের এই বিশাল ব্যবধান দেশটির চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
সংকটের নেপথ্যে গভীর কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক দীর্ঘমেয়াদী কারণ:
১. আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা: কয়েক বছর ধরে চলা কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের তেল রপ্তানি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে।
২. বৈদেশিক বিনিয়োগের অভাব: বৈশ্বিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দেশটিতে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসছে না।
৩. ভুল অর্থনৈতিক নীতি: সরকারের অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বেকারত্ব ও অভাবকে চরমে নিয়ে গেছে।
জনজীবনে প্রভাব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
দ্রব্যমূল্য বাড়লেও মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো এখন অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। খাদ্য ছাড়াও ওষুধ এবং জ্বালানির সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বাজারের থলে নিয়ে মানুষ দোকানে গেলেও খালি হাতে বা সামান্য পণ্য নিয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। ইরানের এই পরিস্থিতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি একটি মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
একঝলকে
- এক মার্কিন ডলার: ১৬,৫০,০০০ ইরানি রিয়াল।
- এক কেজি মাংস: ১,০০,০০,০০০ (এক কোটি) রিয়াল।
- এক কেজি চাল: ৩২,০০,০০০ রিয়াল।
- এক লিটার দুধ: ৮,০০,০০০ রিয়াল।
- একটি ডিম: ১,২৫,০০০ রিয়াল।
- সংকটের মূল কারণ: যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন।