অফিসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা কি ‘পর্নোগ্রাফিক অপরাধ’? বড় রায় বম্বে হাইকোর্টের

অফিসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা কি ‘পর্নোগ্রাফিক অপরাধ’? বড় রায় বম্বে হাইকোর্টের

বম্বে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও আইনি সীমানা নিয়ে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায় প্রদান করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, কোনো নারী সহকর্মীকে ভুলভাবে বা কুরুচিপূর্ণভাবে ঘেরা (Staring) অবশ্যই একটি অনৈতিক ও অনুচিত আচরণ, তবে এটিকে ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩৫৪সি ধারার অধীনে ‘ভয়ারিজম’ বা ‘তাঁতানো’ (Voyeurism) হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

বিচারপতি অমিত বোরকরের একক বেঞ্চ একটি বিমা কো ম্পা নির এক এগজিকিউটিভের বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআর বাতিল করার সময় এই মন্তব্য করেন। আদালত জানায়, আইনের সংজ্ঞাকে তার মূল কাঠামোর বাইরে টেনে নিয়ে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের ধরন

একটি স্বনামধন্য বিমা কো ম্পা নির অভ্যন্তরে এই আইনি বিবাদের সূত্রপাত। সেখানে কর্মরত এক নারী কর্মী তাঁর জ্যেষ্ঠ সহকর্মী নিগুড়করের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, অফিসের মিটিং চলাকালীন ওই ব্যক্তি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বক্ষদেশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। নারী কর্মীর দাবি অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি বিভিন্ন সময় আপত্তিকর মন্তব্যও করতেন, যা কর্মক্ষেত্রের পরিবেশকে চরম অস্বস্তিকর ও অপমানজনক করে তুলত। এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ৩৫৪সি ধারায় মামলা নথিভুক্ত করেছিল।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও আইনি ব্যাখ্যা

মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি অমিত বোরকর উল্লেখ করেন যে, অভিযুক্তের আচরণ যদি সত্যও হয়, তবে তা নৈতিকভাবে ভুল এবং কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির পরিপন্থী। কিন্তু এটি ৩৫৪সি ধারার আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না। আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে আদালত জানায়:

  • ভয়ারিজম বা উঁকিঝুঁকির সংজ্ঞা: ৩৫৪সি ধারা তখনই প্রযোজ্য হয় যখন কোনো ব্যক্তি কোনো নারীকে তাঁর ‘ব্যক্তিগত কাজ’ করার সময় (যেমন—পোশাক পরিবর্তন, শৌচাগার ব্যবহার বা কোনো ব্যক্তিগত যৌনক্রিয়া) দেখেন বা ছবি তোলেন।
  • কর্মক্ষেত্রের অবস্থান: অফিসের মিটিং একটি জনসমক্ষ বা আধা-জনসমক্ষ স্থান হিসেবে বিবেচিত। সেখানে কোনো ব্যক্তিগত বা একান্ত কাজ সম্পন্ন হয় না। ফলে সেখানে ঘেরার বিষয়টি এই নির্দিষ্ট ধারার আওতায় আসে না।
  • অভ্যন্তরীণ তদন্ত: আদালত লক্ষ্য করেছে যে, কো ম্পা নির অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি (ICC) ইতিমধ্যেই বিষয়টির তদন্ত করেছে এবং অভিযুক্তকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেছে। এমন অবস্থায় ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়।

কর্মক্ষেত্রে এই রায়ের সম্ভাব্য প্রভাব

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় কর্মক্ষেত্রে বিবাদের ক্ষেত্রে সঠিক ধারা নির্বাচনের বিষয়ে স্পষ্টতা আনবে। আদালত ঘেরাকে ‘অনৈতিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যার অর্থ হলো—এমন আচরণের জন্য বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (Internal Disciplinary Action) গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিটি অনুচিত আচরণই ‘ভয়ারিজম’-এর মতো গুরুতর অপরাধের শ্রেণিতে পড়ে না। বম্বে হাইকোর্টের এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ফৌজদারি আইনের ব্যাখ্যা করার সময় শব্দ ও সংজ্ঞার কঠোর অনুসরণ জরুরি। অভিযুক্ত এগজিকিউটিভ এই রায়ে বড় স্বস্তি পেলেও, কর্মক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ ও শিষ্টাচার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

একঝলকে

  • আদালতের রায়: কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীকে ঘেরা অনৈতিক হলেও তা আইপিসি ৩৫৪সি অনুযায়ী ‘ভয়ারিজম’ নয়।
  • প্রধান যুক্তি: মিটিং রুম কোনো ব্যক্তিগত বা একান্ত কক্ষ নয়, তাই সেখানে ঘেরাকে ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ বলা যায় না।
  • পূর্ব ইতিহাস: অফিসের অভ্যন্তরীণ কমিটি অভিযুক্তকে আগেই ক্লিন চিট দিয়েছিল।
  • পর্যবেক্ষণ: ফৌজদারি আইনের প্রয়োগ হতে হবে কঠোরভাবে তার সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *