কুসংস্কারের বলি ১৪ বছরের কিশোর! সাপে কাটার পর ৭ ঘণ্টা গঙ্গা নদীতে বেঁধে রাখা হলো নিথর দেহ

কুসংস্কারের বলি ১৪ বছরের কিশোর! সাপে কাটার পর ৭ ঘণ্টা গঙ্গা নদীতে বেঁধে রাখা হলো নিথর দেহ

উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলায় এক মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠা ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। যেখানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিবর্তে আদিম কুসংস্কারের ওপর ভরসা রাখায় অকালে প্রাণ হারিয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর। সর্পদংশনের শিকার ওই কিশোরকে হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা গঙ্গা নদীর স্রোতে বেঁধে রাখা হয়, যার পরিণতিতে মৃত্যু হয়েছে তার।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পরিবারের চরম উদাসীনতা

উত্তরপ্রদেশের পীতমপুর গ্রামের বাসিন্দা জয়রাম সিংয়ের ছোট ছেলে অমিত কুমার (১৪) বৃহস্পতিবার বিকেলে গবাদি পশুর জন্য ঘাস কাটতে মাঠে গিয়েছিল। সেখানে একটি বিষধর সাপ তার হাতে কামড় দেয়। কিছুক্ষণ পরেই অমিত সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে পরিবার তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে কুসংস্কারের পথ বেছে নেয়।

চিকিৎসার নামে মরণফাঁদ

অমিতের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলেও তার বাবা-মা তাকে কোনো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাননি। বরং তারা সম্বল এবং বুলন্দশহর এলাকার বিভিন্ন ওঝা ও তান্ত্রিকের দ্বারে দ্বারে ঘোরেন। সেখানে কোনো কাজ না হওয়ায় স্থানীয়দের পরামর্শে তারা আরও এক চরম অবিবেচক সিদ্ধান্ত নেন। অন্ধবিশ্বাস ছিল যে, সর্পদংশনের শিকার ব্যক্তিকে পবিত্র গঙ্গার স্রোতে ডুবিয়ে রাখলে বিষ নেমে যায়। এই বিশ্বাসে অবন্তিকা দেবী ঘাটে গঙ্গা নদীর জলর ভেতর একটি গাছের সাথে অমিতকে প্রায় ৭ ঘণ্টা বেঁধে রাখা হয়।

মর্মান্তিক পরিণতি ও জলাসমাধি

দীর্ঘ সময় জলর স্রোতে আবদ্ধ থাকার পর কিশোরের শরীরে কোনো স্পন্দন না ফেরায় শুক্রবার মধ্যরাতে পরিবার বুঝতে পারে যে অমিত আর বেঁচে নেই। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অমিত ছিল পরিবারের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। তার এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলেও, কুসংস্কারের কারণে শেষ পর্যন্ত তার মৃতদেহটি সেই গঙ্গা নদীতেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডক্টর শশাঙ্ক চৌধুরী তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে:

  • সময়ের গুরুত্ব: সর্পদংশনের পর তুকতাক বা ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দ্রুত হাসপাতালে অ্যান্টি-ভেনম প্রয়োগ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
  • ভ্রান্ত ধারণা: নদীতে বেঁধে রাখলে বিষ নেমে যায়—এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং দীর্ঘ সময় জলতে আটকে থাকায় শারীরিক অবস্থার আরও দ্রুত অবনতি ঘটে।
  • সচেতনতার অভাব: সব সাপ বিষধর হয় না, কিন্তু ভীতি এবং কুসংস্কারের কারণে সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক মানুষ প্রাণ হারান।

আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও গ্রামীণ জনপদে বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব এবং অন্ধবিশ্বাসের আধিপত্যের কারণে এই প্রাণহানি সমাজ ও সচেতনতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।

একঝলকে

  • শিকার: ১৪ বছরের কিশোর অমিত কুমার (সপ্তম শ্রেণির ছাত্র)।
  • স্থান: আমরোহা জেলা, উত্তরপ্রদেশ।
  • ঘটনা: সর্পদংশনের পর হাসপাতালে না নিয়ে ওঝার শরণাপন্ন হওয়া।
  • ভ্রান্ত চিকিৎসা: গঙ্গা নদীতে দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা বেঁধে রাখা।
  • ফলাফল: সঠিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু এবং নদীতেই জলাসমাধি।
  • বার্তা: সর্পদংশনের একমাত্র সমাধান বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা, কুসংস্কার নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *