রেকর্ডের রানী আশা: ১২ হাজার গান ও ২০টি ভাষা, গিনেস বুকে লেখা যে ইতিহাস আজও অম্লান!

রেকর্ডের রানী আশা: ১২ হাজার গান ও ২০টি ভাষা, গিনেস বুকে লেখা যে ইতিহাস আজও অম্লান!

ভারতীয় সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের জাদুকরী কণ্ঠে শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখা ‘মেলোডি কুইন’ আশা ভোঁসলে প্রয়াত হয়েছেন। ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি ছবির মাধ্যমে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা থেমে গেল ২০২৬ সালের এই বিষণ্ণ লগ্নে। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় পপ ও ধ্রুপদী সংগীতের একটি অধ্যায়ের অবসান হলো।

সুরের আকাশে সাত দশকের সাম্রাজ্য

আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সংগীত বিপ্লব কারী। ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ সিনেমার মাধ্যমে হিন্দি প্লেব্যাক দুনিয়ায় তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আর.ডি. বর্মন বা পঞ্চমের সঙ্গে তাঁর জুটি সংগীত জগতে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল। ‘দম মারো দম’ থেকে শুরু করে ‘পিয়া তু অব তো আজা’— তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য বারবার অবাক করেছে শ্রোতাদের। ওপি নায়ার থেকে শচিন দেব বর্মন, প্রত্যেকের সুরেই তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক কালজয়ী গান।

গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ও বহুমুখী প্রতিভা

আশা ভোঁসলের কর্মজীবন পরিসংখ্যানের বিচারেও বিস্ময়কর। ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করে তিনি নিজের নাম তুলেছেন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। হিন্দি ও বাংলা ছাড়াও মারাঠি, গুজরাটি, তামিল এমনকি ইংরেজি ভাষায়ও তিনি সাবলীল ছিলেন। ক্রিকেট তারকা ব্রেট লি-র সঙ্গে তাঁর ডুয়েট আজও সংগীত প্রেমীদের মনে বিশেষ জায়গা নিয়ে আছে। বলিউডের প্রায় সমস্ত প্রথম সারির অভিনেত্রীর পর্দার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

সংগীতের সীমানা পেরিয়ে প্রাপ্তি

অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’। ২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক স্তরে ১৯৯৭ সালে তিনি গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। বাংলা গানের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; ‘নাচ ময়ূরী নাচ রে’ কিংবা ‘মহুয়ায় জমেছে আজ’ গানগুলো আজও বাঙালির ড্রয়িং রুমে সমান জনপ্রিয়।

ব্যক্তিগত জীবন ও লড়াই

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন— তাঁর জীবন ছিল চড়াই-উতরাইয়ে ভরা। তবে সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন অনন্য উচ্চতায়। তাঁর গাওয়া ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুম নে জো দিল কো’ বা ‘ইন আঁখো কি মস্তি’র মতো গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রেমের ভাষা শিখিয়ে যাবে।

একঝলকে

  • প্রথম প্লেব্যাক: ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাজা বাল’-এ।
  • হিন্দি অভিষেক: ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ সিনেমায়।
  • গিনেস রেকর্ড: ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২,০০০-এর বেশি গান রেকর্ড।
  • পুরস্কার: পদ্মভূষণ (২০০৮) এবং দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার।
  • বিশেষ কৃতিত্ব: ১৯৯৭ সালে গ্র্যামি মনোনয়ন।
  • স্মরণীয় গান: ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায়’, ‘ইন আঁখো কি মস্তি’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *