ইশতেহারে শব্দের লড়াই! মহিলা ভোট টানতে মমতার অস্ত্র ৪২, বিজেপির ২৪

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের রাজনীতিতে এখন নারী ভোট ব্যাংকই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে তামিলনাড়ু—সব রাজ্যের নির্বাচনী ইশতেহারেই এখন ‘নারী’ শব্দের জয়জয়কার। রাজনৈতিক দলগুলো বুঝতে পেরেছে যে, গদি দখলের চাবিকাঠি এখন মহিলাদের হাতেই রয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি বিশাল সংখ্যক আসনে পুরুষদের তুলনায় নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই প্রবণতাকে মাথায় রেখেই ২০২৬-এর নির্বাচনী রণকৌশল সাজিয়েছে দলগুলো।
ইশতেহারে শব্দের লড়াই: নারী শব্দই যখন অগ্রাধিকার
নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী কল্যাণ। তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) তাদের ৮৮ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ইশতেহারে ‘নারী’ শব্দটি ব্যবহার করেছে মোট ৪২ বার। পিছিয়ে নেই বিজেপিও; মাত্র ১৩ পৃষ্ঠার ইশতেহারের একটি নির্দিষ্ট পাতাতেই তারা ২৪ বার এই শব্দের উল্লেখ করেছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুতেও। সেখানে এআইএডিএমকে (AIADMK) তাদের ইশতেহারে ৩৫ বার নারী শক্তির কথা বলেছে। অন্যদিকে, ডিএমকে (DMK) তাদের ইশতেহারে ছাত্রছাত্রীদের পর নারী শব্দটিকে চতুর্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছে।
পরিসংখ্যানের গুরুত্ব ও নারী ভোটারদের দাপট
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৪৪টিতে (প্রায় ৪৯ শতাংশ) পুরুষদের চেয়ে নারী ভোটাররা বেশি ভোট দিয়েছেন। তামিলনাড়ুতেও ২৩৪টি আসনের মধ্যে ৮৩টিতে একই চিত্র দেখা গেছে। এই পরিসংখ্যানটিই রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করছে নারীদের জন্য বিশেষ প্রকল্প ও প্রতিশ্রুতি দিতে। সামান্য কয়েক শতাংশ ভোটের ব্যবধানই যেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দেয়, সেখানে নারী ভোটারদের মন জয় করা এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্মীর ভান্ডার বনাম সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার তাদের সাফল্যের বড় অংশ দাবি করে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের জন্য। এবারের ইশতেহারে তারা তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলাদের জন্য মাসিক ১,৭০০ টাকা এবং সাধারণ বিভাগের মহিলাদের জন্য ১,৫০০ টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পাল্টা চালে বিজেপি বড়সড় কাঠামোগত পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়েছে। তারা ক্ষমতায় এলে পুলিশ বাহিনীসহ রাজ্য সরকারের সমস্ত চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দক্ষিণের রাজনীতিতেও আর্থিক সহায়তার হিড়িক
তামিলনাড়ুতে ডিএমকে সরকার ইতিপূর্বেই ১.৩ কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে ৫,০০০ টাকা করে জমা দিয়েছে। ২০২৬-এর ইশতেহারে তারা ড্রোন পাইলট প্রশিক্ষণের মতো কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পের কথা বলছে। বিপরীতে, এআইএডিএমকে ‘কুলা ভিলাক্কু’ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবারপিছু মাসিক ২,০০০ টাকা সরাসরি নারী প্রধানের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ঝুঁকির সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে যেখানে লিঙ্গভিত্তিক ভোটের ব্যবধান অত্যন্ত কম, সেখানে সামান্য ভোটের এদিক-সেদিক হওয়া মানেই বড় কোনো বিপর্যয়। ফলে শুধুমাত্র আর্থিক ভাতা বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কতটা স্থায়ী সমর্থন পাওয়া যাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিশ্লেষণ চলছে।
একঝলকে
- তৃণমূল কংগ্রেস: ইশতেহারে ৪২ বার ‘নারী’ শব্দের প্রয়োগ এবং লক্ষ্মীর ভান্ডারে ভাতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি।
- বিজেপি: রাজ্য সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ঘোষণা।
- তামিলনাড়ু (DMK ও AIADMK): মাসিক অর্থ সাহায্য ও কর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণের আশ্বাস।
- ভোটের চিত্র: পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক আসনে নারী ভোটারদের দাপট ছিল পুরুষদের তুলনায় বেশি।