উইল না করেই মৃত্যু হলে সম্পত্তির মালিক কে? জেনে নিন কী বলছে আইন!

ভারতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে প্রায়ই জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তি তার স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির বিষয়ে কোনো উইল বা উইলনামা তৈরি না করে মারা যান, তখন সেই সম্পত্তির বণ্টন কীভাবে হবে তা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এবং ২০০৫ সালের সংশোধনী আইন অনুযায়ী, এই ধরনের ক্ষেত্রে সম্পত্তির বণ্টন একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়।
উত্তরাধিকারী নির্ধারণ ও আইনের প্রয়োগ
উইল ছাড়া কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তার সম্পত্তি প্রধানত দুই ধরনের উত্তরাধিকারীর মধ্যে ভাগ করা হয়। আইনের ভাষায় এদের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির উত্তরাধিকারী বলা হয়।
প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী (Class-I Heirs)
সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার পান এই শ্রেণির সদস্যরা। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়:
- মা: মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার মায়ের প্রথম অধিকার থাকে। তবে এক্ষেত্রে বাবার কোনো প্রাথমিক অধিকার থাকে না।
- স্ত্রী: স্বামী মারা গেলে তার সম্পত্তিতে স্ত্রীর সমান অংশীদারিত্ব থাকে।
- পুত্র ও কন্যা: ২০০৫ সালের আইন সংশোধনের পর থেকে বাবার সম্পত্তিতে পুত্রের সমান অধিকার পান কন্যারাও। অবিবাহিত বা বিবাহিত—উভয় ক্ষেত্রেই কন্যারা সমান ভাগীদার।
- প্রয়াত সন্তানদের বংশধর: যদি কোনো পুত্র বা কন্যা বাবার আগেই মারা যান, তবে তাদের প্রাপ্য অংশ তাদের সন্তানরা (নাতি-নাতনি) পাবেন।
- দত্তক নেওয়া সন্তান: আইনত দত্তক নেওয়া সন্তানদেরও জন্মগত সন্তানদের মতোই সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণির উত্তরাধিকারী (Class-II Heirs)
যদি প্রথম শ্রেণির কোনো উত্তরাধিকারী জীবিত না থাকেন, তবেই কেবল দ্বিতীয় শ্রেণির আত্মীয়রা সম্পত্তির দাবি করতে পারেন। এই তালিকায় রয়েছেন বাবা, ভাই, বোন এবং তাদের সন্তানরা।
বিশেষ ক্ষেত্রে আইনি অবস্থান
সম্পত্তি নিয়ে জটিল পরিস্থিতির সমাধানে আইন অত্যন্ত স্পষ্ট:
- একাধিক স্ত্রী থাকলে: ১৯৫৫ সালের আগে করা বিয়ের ক্ষেত্রে উভয় স্ত্রী সম্পত্তির ভাগ পেতেন। কিন্তু বর্তমানে দ্বিতীয় বিয়ের আইনি বৈধতা নেই। ফলে দ্বিতীয় স্ত্রী সম্পত্তিতে অধিকার পান না। তবে তার গর্ভজাত সন্তানরা বাবার স্বোপার্জিত সম্পত্তিতে ভাগ পাওয়ার যোগ্য, যদিও পৈতৃক সম্পত্তিতে তাদের অধিকার থাকে না।
- বিচ্ছেদ হওয়া স্ত্রীর সন্তান: স্ত্রীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদ হলেও সন্তানদের সাথে বাবার রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না। তাই প্রথম পক্ষের সন্তানরা আইনিভাবেই বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন।
প্রয়োজনীয় নথিপত্র
উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানা নিজের নামে পরিবর্তন করতে কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়:
- মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ (Death Certificate)।
- পরিবারের সদস্য তালিকা সম্বলিত ফ্যামিলি মেম্বার সার্টিফিকেট।
- আদালত বা সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে সংগৃহীত লিগ্যাল হেয়ার সার্টিফিকেট বা উত্তরাধিকারী সনদ।
বিশ্লেষকদের মতে, উইল না থাকলে আইন অনুযায়ী বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ঠিকই, কিন্তু অনেক সময় পারিবারিক বিবাদের সৃষ্টি হয়। তাই ভবিষ্যৎ জটিলতা এড়াতে জীবিত অবস্থায় উইল করে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
একঝলকে
- উইল না থাকলে ১৯৫৬ ও ২০০৫ সালের উত্তরাধিকার আইন কার্যকর হয়।
- মা, স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সমান অংশীদার হিসেবে গণ্য হন।
- ২০০৫ সাল থেকে কন্যারা পুত্রের সমান আইনি অধিকার লাভ করেছেন।
- প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারী না থাকলে দ্বিতীয় শ্রেণির আত্মীয়রা সম্পত্তি পান।
- মালিকানা পরিবর্তনের জন্য লিগ্যাল হেয়ার সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক।