ডিজিটাল অ্যারেস্টের ফাঁদ রুখতে সিবিআইয়ের সাইবার অস্ত্র ‘অভয়’

ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে সাইবার অপরাধীদের নিত্যনতুন কৌশলে সাধারণ মানুষের রাতের ঘুম উড়ছে। সম্প্রতি দেশজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ নামক এক ভয়ংকর প্রতারণা চক্র। হোয়াটসঅ্যাপ বা স্কাইপ ভিডিও কলে পুলিশের ভুয়া ইউনিফর্ম পরে, ব্যাকগ্রাউন্ডে থানার সেট বানিয়ে সাধারণ মানুষকে মাদক পাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াতরা। এই ক্রমবর্ধমান অপরাধের রাশ টানতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিসমৃদ্ধ নতুন সাইবার অস্ত্র ‘অভয়’ নিয়ে এল ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)।
ভয়ের চাদরে যেভাবে বোনা হয় ব্ল্যাকমেলের জাল
প্রতারকদের মূল হাতিয়ার হলো ভুক্তভোগীর মনে তীব্র ভীতি ও একাকীত্ব তৈরি করা। সাধারণত কোনো ব্যক্তির আইডেন্টিটি বা আধার কার্ড ব্যবহার করে দুবাই বা অন্য কোথাও ড্রাগস ও বেআইনি পার্সেল পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এরপর আদালতের ভুয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা আইনি নথির ছবি পাঠিয়ে বলা হয়, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শিকারকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করা হবে। লোকলজ্জা ও আইনি জটিলতার ভয়ে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখন বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় রাখার নির্দেশ দেয় অপরাধীরা। চূড়ান্ত ধাপে, মামলা থেকে রেহাই বা জামিনের নাম করে ব্যাংকে মোটা অঙ্কের টাকা ট্রান্সফার করতে বাধ্য করা হয় এবং টাকা পেলেই নম্বর ব্লক করে দেয় তারা।
বাস্তবে দেশের আইনে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’, ‘ভার্চুয়াল থানা’ কিংবা ‘অনলাইন জেরা’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। পুলিশ, সিবিআই কিংবা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র মতো কোনো সংস্থাই ফোনে বা ভিডিও কলে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। গ্রেপ্তারের জন্য সশরীরে উপস্থিত হয়ে আইনি ওয়ারেন্ট দেখানো বাধ্যতামূলক।
মাত্র ৩০ সেকেন্ডে জালিয়াতের মুখোশ খুলবে এআই
সাইবার অপরাধীদের এই আধুনিক প্রযুক্তিগত জালিয়াতি রুখতে সিবিআই তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট থেকে ‘অভয়’ নামের একটি বিশেষ এআই টুল চালুর ঘোষণা দিয়েছে। সন্দেহজনক কোনো কল বা ভিডিও বার্তার মুখোমুখি হলে ভুক্তভোগী সেই কলের রেকর্ড বা স্ক্রিনশট এই অ্যাপে আপলোড করে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সত্যতা যাচাই করতে পারবেন।
এই অ্যান্টি-ফ্রড অ্যাপ্লিকেশনটি মূলত চারটি স্তরে কাজ করে। প্রথমত, এটি অপরাধীদের ব্যবহৃত কৃত্রিম কণ্ঠস্বর বা ‘ভয়েস ক্লোন’ শনাক্ত করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, ভিডিও কলের ব্যাকগ্রাউন্ডের পিক্সেল, আলো এবং ছায়া স্ক্যান করে এটি নিমেষেই ধরে ফেলে পেছনের দৃশ্যটি আসল থানা নাকি কোনো সাজানো স্টুডিও। তৃতীয়ত, সিবিআই ও পুলিশের সমস্ত বৈধ নম্বরের একটি ডেটাবেস এই অ্যাপে সংরক্ষিত থাকায় অননুমোদিত নম্বর থেকে কল এলেই এটি লাল সংকেত দেখায়। সবশেষে, প্রতারকদের পাঠানো ভুয়া নথির কিউআর কোড, সিল ও ফন্ট স্ক্যান করে মাত্র ১০ সেকেন্ডে সেটির সত্যতা নিশ্চিত করে এই প্রযুক্তি। যাচাইয়ের পর তথ্যটি ভুয়া প্রমাণিত হলে অ্যাপ থেকেই সরাসরি জাতীয় সাইবার হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০-এ রিপোর্ট করার সুযোগ রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে দ্রুত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।