নিজেদের বুথেই ধরাশায়ী হেভিওয়েটরা, দলের অস্বস্তি বাড়িয়ে প্রকাশিত বিধানসভা ভোটের বুথভিত্তিক ফলাফল!

গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের আস্থা অর্জন করা তো দূরের কথা, ভোটযুদ্ধে নেমে তাবড় তাবড় অনেক প্রার্থী নিজের বুথের ভোটারদের বিশ্বাসই অর্জন করতে পারেননি। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের বুথভিত্তিক ফলাফল প্রকাশের পর এমনই এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বুথভিত্তিক হিসাবনিকাশ বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, পরাজয়ের এই তালিকায় যেমন রয়েছেন শাসকদল তৃণমূলের হেভিওয়েট মন্ত্রী-বিধায়করা, তেমনই আছেন বিরোধী শিবিরের প্রথম সারির বাম-কংগ্রেস ও আইএসএফ নেতারাও। কেউ কেউ সশরীরে বিধানসভায় পৌঁছালেও নিজের ঘরের মাঠে মুখরক্ষা করতে পারেননি।
শাসকশিবিরের অন্তর্দলীয় ক্ষোভ ও সাংগঠনিক দুর্বলতা
ফলাফলের সামগ্রিক চিত্রের মতোই নিজের বুথে হারের নিরিখে এগিয়ে রয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীরা। দিনহাটায় নিজের বুথেই হেরেছেন রাজ্যের প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ। জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তথা এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণ নিজের বুথেই তৃণমূলকে জেতাতে পারেননি। টালিগঞ্জে পরাজিত প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রের যে বুথের ভোটার, সেখানেও ফুটেছে পদ্মফুল। বাদ যাননি লাভলি মৈত্র, অদিতি মুন্সি, মৌসম বেনজির নুর কিংবা বীরবাহা হাঁসদার মতো চেনা মুখেরা।
এমনকি সাগরদিঘি আসনে জয়ী তৃণমূলের বাইরন বিশ্বাস সমশেরগঞ্জের নিজের বুথে হেরেছেন। একই অবস্থা মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সদস্য মধুপর্ণা ঠাকুরের, গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রে নিজের বুথেই মুখ থুবড়ে পড়েছেন তিনি। এছাড়া সোহম চক্রবর্তী, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ব্রাত্য বসু এবং নন্দীগ্রামের ‘ভূমিপুত্র’ পবিত্র কর নিজ নিজ বুথ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম কলকাতা বন্দর থেকে জিতলেও ভবানীপুরে তাঁর নিজের বুথে জয়ী হয়েছে বিজেপি। আবার বেলেঘাটা থেকে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও নিজের বাড়ির বুথে হেরে গিয়েছেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। বীরভূমের হাসনে জয়ী কাজল শেখের নিজের বুথ নানুরেও হেরেছে তৃণমূল।
ব্যর্থ বিরোধী শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বও
পরাজয়ের এই ধারা থেকে মুক্ত নয় বিরোধী শিবিরও। বামেদের তরুণ তুর্কিদের মধ্যে দীপ্সিতা ধর ডোমজুড়ের নিজের বুথে, কলতান দাশগুপ্ত জলহাটিতে এবং মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায় কুলটিতে নিজের বুথে বামেদের জেতাতে পারেননি। যাদবপুরের বাম প্রার্থী তথা প্রবীণ নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও নিজের বুথে পরাস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বহরমপুরের বহু বছরের ‘অধিনায়ক’ প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বহরমপুর কেন্দ্রে পরাজিত হওয়ার পাশাপাশি নিজের বুথেই হেরে গিয়েছেন। আইএসএফ নেতা নওশাদ সিদ্দিকির নিজের বুথ হুগলির ফুরফুরায় তাঁর শরিক দল সিপিএম খাতা খুলতে পারেনি।
ভোটের কারণ ও আগামী দিনে সম্ভাব্য প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হেভিওয়েট প্রার্থীদের এই বুথ বিপর্যয়ের পেছনে প্রধান কারণ হলো স্থানীয় স্তরের অন্তর্দ্বন্দ্ব, জনপ্রতিনিধিদের একাংশের প্রতি বুথ স্তরের ভোটারদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং জনসংযোগের অভাব। প্রার্থীরা বড় জনসভা বা সামগ্রিক প্রচারের ওপর জোর দিলেও, একদম বুথ স্তরের কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় সমীকরণ বুঝতে না পারাই এই ফলাফলের মূল কারণ।
সামনে রয়েছে কলকাতা পুরসভা সহ রাজ্যের বাকি পুরসভাগুলির নির্বাচন। শহরাঞ্চলে একটি ওয়ার্ডের ভাগ্য নির্ধারণে এই বুথগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের ঘরের মাঠেই যেভাবে দলের হেভিওয়েটরা পরাস্ত হয়েছেন, তা আগামী পুরভোটের আগে তৃণমূল শিবিরের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও চিন্তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। অন্যদিকে, হেভিওয়েটদের বুথেই শাসকদলকে পর্যুদস্ত করে বিজেপি আগামী পুরভোটের লড়াইয়ে অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেল।