ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে কি এবার সত্যিই শেষ হচ্ছে ইদের নামাজ?

কলকাতার রেড রোড চত্বরে ইদের নামাজ পড়া দীর্ঘদিনের এক সামাজিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। বিগত তৃণমূল জমানায় এই আয়োজন এক অনন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক উচ্চতা পেয়েছিল। প্রাক্তন বাম মুখ্যমন্ত্রীরা এই মঞ্চে না গেলেও তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতি বছর ইদের সকালে এখানে উপস্থিত হওয়াকে এক অলিখিত রেওয়াজে পরিণত করেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তরসূরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও দেখা যেত। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই চেনা ছবিতে বড় বদল আসতে চলেছে। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর ক্ষমতায় নেই। এই নতুন পরিস্থিতিতে এবার হয়তো রেড রোডে ইদের নমাজ পড়ার অনুমতি আর দেবে না সেনাবাহিনী।
সেনা কর্তৃপক্ষের অনড় অবস্থান ও কারণ
রেড রোডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে ফোর্ট উইলিয়ামের সেনা বাহিনীর হাতে। সেখানে যেকোনো বড় অনুষ্ঠানের জন্য সেনার ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। সেনা সূত্রের দাবি, রাজ্যে সরকার বদলের কারণে রাতারাতি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। গত বছরই নমাজের প্রধান আয়োজক সংস্থা ‘খিলাফত কমিটি’-কে নিরাপত্তার স্বার্থে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, রেড রোডে আর নমাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানালে সেবার ‘শেষবারের মতো’ ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। এবার রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং সেই রাজনৈতিক অনুরোধের সুযোগ না থাকায় সেনাবাহিনী তাদের পুরনো সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে চলেছে। একই সাথে, আসন্ন বখরি ইদে পশু বলি নিয়ে পূর্ববর্তী নিয়ম ও নির্দেশিকা কঠোরভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন প্রশাসন, যা এই পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
বিকল্প হিসেবে ব্রিগেডের চর্চা ও সামাজিক প্রভাব
সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্মাচরণের অধিকার রক্ষা করা এবং এত বড় জমায়েতের জন্য বিকল্প নিরাপদ জায়গার বন্দোবস্ত করার দায় এখন নবান্নের নতুন প্রশাসনের ওপর। নবান্ন সূত্রে খবর, সেনাবাহিনী রেড রোডের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে বিকল্প হিসেবে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ইদের নমাজ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এই বিষয়ে খিলাফত কমিটিসহ আয়োজকদেরও আগাম বার্তা দিয়ে রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের মতে, ব্রিগেডের মাঠে এর আগেও বহু ধর্মীয় সমাবেশ হয়েছে এবং গত বছরই সেখানে ‘লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠের’ মতো বিরাট অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে ব্রিগেডের মাঠেই ইদের নমাজের বিকল্প ব্যবস্থা করাটা প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে সুবিধাজনক ও বাস্তবসম্মত পথ। রাজ্যের ক্ষমতার অলিন্দে এই বড় সিদ্ধান্তের জেরে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সমাবেশের এই স্থান বদল আগামী দিনে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।