ধর্ণা মঞ্চে ব্রাত্য অভিষেক! কালীঘাটের সমীকরণে বড় বদল

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এবার খোদ বিধানসভা চত্বরেই প্রকাশ পেয়ে গেল বিদায়ী শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের চরম কঙ্কালসার ও ছন্নছাড়া চেহারা। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর কালীঘাটের অন্তরালে চলে গিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার সাংসদ হওয়ায় বিধানসভার অধিবেশনে তাঁর উপস্থিতির সুযোগ নেই। এই দুই শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে বুধবার বিধানসভার আম্বেডকর মূর্তির পাদদেশে আয়োজিত দলীয় কর্মসূচিতে ঘাসফুল শিবিরের বিধায়কদের যে ‘বিদ্রোহ ও অনীহা’ সামনে এলো, তা টলিয়ে দিয়েছে আলিপুরের অলিন্দকে।
নির্বাচনের পর এই প্রথম কোনো বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ৮০ জন জয়ী বিধায়কের মধ্যে ৪৬ জনই এই কর্মসূচিতে যোগ না দেওয়ায় মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই নমো নমো করে ধর্ণা গুটিয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হলেন শোভনদেব-কুণালরা। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি আসলে তৃণমূলের ভাঙা হাটের এক চূড়ান্ত দলিল।
শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা! কুণাল-শোভনদেবের পরস্পরবিরোধী যুক্তি
ভোট-পরবর্তী হিংসা ও হকার উচ্ছেদের মতো বিষয়কে হাতিয়ার করে বিধানসভা চত্বরে ধর্ণায় বসেছিলেন তৃণমূল বিধায়করা। কিন্তু অর্ধেকেরও বেশি আসন খালি থাকায় সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের মুখে পড়েন নেতারা। সাফাই দিতে গিয়ে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ দাবি করেন:
“আমাদের পরিষদীয় দলের বৈঠক থেকেই এই কর্মসূচি ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। কিছু বিধায়ক এখানে বসবেন, আর যাঁরা সীমান্ত বা নিজের এলাকা সামলাচ্ছেন, তাঁদের সেখানে থাকতে বলা হয়েছে। বহু এলাকায় মানুষ ঘরছাড়া, তাঁদের থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বিধায়কদের কো-অর্ডিনেট করতে বলা হয়েছে।”
কুণালের এই ‘এলাকা সামলানো’র তত্ত্ব অবশ্য ধোপে টেকেনি খোদ দলেরই প্রবীণ বিধায়ক তথা বালিগঞ্জের প্রতিনিধি শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বয়ানে। কুণালের শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা ব্যর্থ করে শোভনদেব বাবু সরাসরি স্বীকার করে নেন দলের অন্দরের চরম বিশৃঙ্খলা। তিনি বলেন, “আমাদের বহু নেতা-কর্মীকে পুলিশ কেস দেওয়া হচ্ছে। সেই সমস্ত ঝামেলা সামাল দিতে গিয়েই বহু বিধায়ক আটকে পড়েছেন এবং আসতে পারেননি। তবে আমরা সবাই একসঙ্গেই আছি।”
ধর্ণা মঞ্চে ব্রাত্য অভিষেক! কালীঘাটের সমীকরণে বড় বদল
এদিনের কর্মসূচিতে সবথেকে বড় চমক ছিল স্লোগানের রাজনীতিতে। একসময় তৃণমূলের যেকোনো সভা-সমাবেশ বা ধর্ণা মঞ্চে ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ’ স্লোগানের পাশাপাশি সমস্বরে উচ্চারিত হতো ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ’ ধ্বনি। কিন্তু বুধবারের ধর্ণা মঞ্চে মমতার নামে স্লোগান উঠলেও, অভিষেকের নাম কার্যত উধাও ছিল। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন দলের অন্দরে পিসি-ভাইপোর ক্ষমতার সমীকরণ এবং ব্যাটন বদলের লড়াইয়ে এক বিরাট ফাটলের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খানকে ঘিরে দলে তীব্র বিদ্রোহ
তৃণমূলের এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহের আঁচ শুধু বিধানসভায় নয়, দুই দিন আগে কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকেও দেখা গিয়েছিল। সেখানেও একাধিক নবনির্বাচিত বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন। আর যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার ও ফলতা অঞ্চলের দাপুটে নেতা জাহাঙ্গির খানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন।
উল্লেখ্য, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ২১শে মে অর্থাৎ আজই পুনর্নির্বাচন (Repoll) হওয়ার কথা। এই কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানকে মূলত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও ‘ডান হাত’ হিসেবে দেখা হয়। তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার ও ভোটের টিকিট পাওয়া নিয়ে দলের অন্দরেই ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল। একাধিক বিধায়ক দলনেত্রীর সামনেই দাবি তুলেছেন, জাহাঙ্গির খানের বিরুদ্ধে দল যেন অবিলম্বে কড়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করে।
তৃণমূলে কি এবার বড়সড় ধস? কটাক্ষ বিজেপির
২৯৪ আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৩টি আসনের ফলাফলে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নবান্ন দখল করেছে এবং মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন শুভেন্দুই। ঘাসফুল শিবির আটকে গিয়েছে মাত্র ৮০টি আসনে। বিজেপির দাবি, নির্বাচনের এই ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে সাংসদ ও বিধায়কদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে সল্টলেক ও কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাধিক বেনামি সম্পত্তিতে পুরসভার বুলডোজার নোটিশ, বিধাননগরের কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দারের তোলাবাজির দায়ে গ্রেফতারি এবং হালিশহর পুরসভায় ১৬ জন তৃণমূল কাউন্সিলরের গণইস্তফা— এই ত্রিমুখী ধাক্কায় যখন ঘাসফুল শিবির কোণঠাসা, ঠিক তখনই বিধানসভায় ৪৬ জন বিধায়কের এই ‘অনুপস্থিতি’ প্রমাণ করে দিল যে, বাংলায় তৃণমূলের দিন এবার শেষের মুখে। দলের একটা বড় অংশ এখন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে তলে তলে যোগাযোগ রাখছে বলেই সূত্রের খবর।