মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ বাধ্যতামূলক করার আদেশে তুঙ্গে সংঘাত! শুভেন্দু সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হুমায়ুন কবির

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক নিয়মে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যে সমস্ত আমূল বদল আসছে, তার মধ্যে সবথেকে বড় বিতর্কের জন্ম দিল মাদ্রাসায় জাতীয় গীত বাধ্যতামূলক করার নির্দেশিকা। স্কুল শিক্ষা দফতরের পর এবার রাজ্যের সমস্ত সরকারি, সাহায্যপ্রাপ্ত এবং স্বীকৃত মাদ্রাসায় ক্লাস শুরুর আগে প্রার্থনা সভায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া অবিলম্বে বাধ্যতামূলক করেছে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর।
নবান্নের এই কড়া নির্দেশের পরই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ ও সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। সরকারের এই আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন অল ইন্ডিয়া জাস্টিস অ্যান্ড ইউনাইটেড ফ্রন্ট (AIJUF)-এর চেয়ারম্যান তথা বাংলায় বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণ আন্দোলনের নেপথ্যের অন্যতম মুখ হুমায়ুন কবির।
মাদ্রাসার বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার সরকারের নেই— হুমায়ুন কবির
মাদ্রাসায় বন্দে মাতরম গাওয়ার সরকারি নির্দেশিকাকে সরাসরি বয়কটের ডাক দিয়ে সুর চড়িয়েছেন হুমায়ুন কবির। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই মাদ্রাসায় বন্দে মাতরম গাওয়া হবে না। তাঁর অভিযোগ, মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এই ধরনের বাধ্যতামূলক আদেশ জারি করার কোনো এক্তিয়ার বা অধিকার বর্তমান রাজ্য সরকারের নেই।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এই নতুন নিয়মটি রাজ্য সরকারের সংখ্যালঘু বিষয়ক এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে পরিচালিত সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, ক্লাস শুরুর আগে দৈনিক প্রার্থনা সভায় এই গান গাওয়া এখন থেকে আইনি নিয়মে পরিণত হলো।
স্কুল থেকে মাদ্রাসা— শুভেন্দু সরকারের ‘বন্দে মাতরম’ নীতি
উল্লেখ্য, মাদ্রাসায় এই নিয়ম বলবৎ করার ঠিক এক সপ্তাহ আগেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্কুল শিক্ষা দফতরের অধীনস্থ রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে সকালের সমাবেশে ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি শ্লোক গাওয়া বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের শিক্ষা নির্দেশিকা ও শিথিলতা প্রত্যাহার করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোশাল মিডিয়ায় স্পষ্ট জানিয়েছিলেন:
“পূর্বের সমস্ত নির্দেশ বা নিয়ম প্রত্যাহার করে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার স্কুল শিক্ষা বিভাগের অধীনস্থ সমস্ত স্কুলের জন্য ক্লাস শুরু হওয়ার আগে স্কুল সমাবেশ বা সকালের প্রার্থনার সময় ভারতের জাতীয় গীত ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া অবিলম্বে বাধ্যতামূলক করল।”
স্কুলের এই সিদ্ধান্তের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার মাদ্রাসা পরিকাঠামোতেও একই নিয়ম চালুর জেরে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে সংখ্যালঘু নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে।
‘দেশকে ভালোবাসি কিন্তু পূজা করি না’— সরব কলকাতা খিলাফত কমিটি
নবান্নের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে মুখ খুলেছেন কলকাতা খিলাফত কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আশরাফ আলী কাসমি। রাজ্য সরকারকে এই বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে খিলাফত কমিটির প্রধান স্পষ্ট জানান:
- ধর্মের ভিত্তিতে শাসন নয়: সরকারের কাজ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কাজ করা নয়। সরকারের মূল দায়িত্ব হলো নাগরিকদের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
- ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত: কাসমি বলেন, “আমরা বলছি না যে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি খারাপ বা এটি কেউ গাইবে না। কিন্তু মুসলমানদের ওপর এটি জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায়। কারণ এই গানের কিছু নির্দিষ্ট পঙক্তি বা লাইন আমাদের ইসলামিক ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী।”
- একমাত্র আল্লাহর উপাসনা: দেশপ্রেমের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আমরা খুব পরিষ্কারভাবে বলছি যে আমরা এই স্বাধীন ভারতবর্ষে বাস করি এবং এই দেশকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। কিন্তু আমরা এই দেশের ‘পূজা’ বা আরাধনা করতে পারি না। কারণ ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী মুসলমানরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উপাসনা বা বন্দনা করে না।”
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে বড়সড় রদবদলের পর অনুপ্রবেশ রুখতে ‘থ্রি-ডি’ নীতি এবং তোষণ বন্ধে ‘বিবেকানন্দ স্কলারশিপ’ চালুর পর শুভেন্দু সরকারের এই ‘বন্দে মাতরম’ কার্ড অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। একদিকে সরকার যখন জাতীয়তাবাদ ও স্কুল-মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম ও প্রার্থনা স্তরে শৃঙ্খলা আনার পক্ষে অনড়, ঠিক অন্যদিকে সংখ্যালঘু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলি একে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। আগামী দিনে এই আইনি আদেশকে কেন্দ্র করে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।