আইনের ফাঁক গলে রেগুলারাইজেশন, বেআইনি নির্মাণ রুখতে স্পষ্ট নির্দেশিকার দাবিতে সরব পুরকর্তারা

আইনের ফাঁক গলে রেগুলারাইজেশন, বেআইনি নির্মাণ রুখতে স্পষ্ট নির্দেশিকার দাবিতে সরব পুরকর্তারা

কলকাতা পুর এলাকায় বেআইনি নির্মাণ রুখতে যখন চারদিকে বুলডোজার অভিযান জোরদার হচ্ছে, ঠিক তখনই ‘রেগুলারাইজেশন’ বা জরিমানার বিনিময়ে অবৈধ নির্মাণ বৈধ করা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বর্তমান পুর আইনে একাধিক অস্পষ্টতা ও ফাঁকফোকর থাকার কারণে বছরের পর বছর ধরে বহু গুরুতর বিধিলঙ্ঘন করা নির্মাণও পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ খোদ কলকাতা পুরসভার কর্তাদের একাংশের। এই আইনি ধোঁয়াশা ও অস্বস্তি দূর করতে এবার পুর আইনে স্পষ্ট সংশোধনী ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকার দাবি তুলেছেন আধিকারিকেরা।

আইনি অস্পষ্টতা ও অনিয়মের উৎস

কলকাতা পুরসভা ২০১৫ সালে ‘কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (রেগুলারাইজেশন অফ বিল্ডিং) রেগুলেশনস, ২০১৫’ চালু করে। এই সংশোধিত বিধিতে বলা হয়েছিল, অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যান থেকে ‘ক্ষুদ্র বিচ্যুতি’ বা ছোটখাটো ব্যত্যয় ঘটলে নির্দিষ্ট জরিমানার বিনিময়ে সেই নির্মাণকে বৈধতা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, আইনে কোথাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি যে কতটা বিচ্যুতিকে ‘ক্ষুদ্র’ বা ‘মাইনর ডেভিয়েশন’ বলা হবে। এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিমাপ বা সংজ্ঞা না থাকায় বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিক বা পুরকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা ও বিবেচনার উপর। অভিযোগ উঠেছে, এই আইনি ধোঁয়াশার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বা মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বহু বড়সড় বেআইনি নির্মাণকেও ‘বৈধ’ করে দেওয়া হয়েছে।

স্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের দাবি

পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকদের মতে, আইনের এই ফাঁক বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে শহর থেকে অবৈধ নির্মাণের দাপট কমানো আসাম্ভব। তাঁরা চাইছেন, আইনে স্পষ্ট সংশোধনী এনে ঠিক কত শতাংশ অতিরিক্ত নির্মাণ, কতটা পার্শ্ব-ফাঁক (সাইড মার্জিন) কম থাকা, উচ্চতার কতটা তারতম্য বা কতখানি অতিরিক্ত নির্মিত এলাকা পর্যন্ত নিয়মভঙ্গকে ‘ছোটখাটো’ বলে গণ্য করা হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে এই বিচ্যুতি পরিমাপের একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন, যাতে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর সিদ্ধান্ত থমকে না থাকে। এতে যেমন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, তেমনই বেআইনি নির্মাণকে বৈধ করার অপব্যবহারও কমবে।

জাতীয় প্রেক্ষাপট ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

অবৈধ নির্মাণকে বৈধ করা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত কড়া। শীর্ষ আদালত একাধিক মামলায় স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘রেগুলারাইজেশন’ কখনো সাধারণ নিয়ম হতে পারে না, তা হওয়া উচিত শুধুমাত্র ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। লাগাতার এই সুযোগ দিলে আইনভঙ্গের প্রবণতা উৎসাহিত হয় এবং সামগ্রিক নগর পরিকল্পনা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

অবশ্য কলকাতার বাইরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এখনও অবৈধ নির্মাণ বৈধকরণের আলাদা আইন বা সাধারণ ক্ষমা প্রকল্প চালু রয়েছে। মহারাষ্ট্রের মুম্বই ও নবি মুম্বই, দিল্লির অননুমোদিত কলোনি বৈধকরণ প্রকল্প, কর্নাটকের ‘আক্রম-সক্রম’, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং গুজরাতের বিভিন্ন নগর এলাকায় নির্দিষ্ট জরিমানার বিনিময়ে বৈধকরণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সব জায়গাতেই নির্দিষ্ট সময়সীমা, পরিকাঠামো মাসুল এবং কঠোর কিছু শর্ত মানতে হয়। বিশেষ করে উপকূলীয় নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল, বনভূমি, প্রতিরক্ষা জমি, খেলার মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান দখল করে তৈরি নির্মাণ কিংবা বিপজ্জনক ভবনকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়া হয় না। কলকাতা পুরকর্তাদের মতে, কলকাতাতেও যদি অন্য রাজ্যগুলোর মতো এমন স্পষ্ট, কঠোর ও পরিমাপযোগ্য নীতিমালা চালু করা যায়, তবেই শহরের বেআইনি নির্মাণে প্রকৃত লাগাম টানা সম্ভব হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *