ডিটেনশন সেন্টারের পথেই কি রাজ্যের হোল্ডিং সেন্টার?

পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা সন্দেহে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য জেলায় জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরির নির্দেশ দিয়েছে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে সমস্ত জেলাশাসককে সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক এবং সাজাপ্রাপ্ত বিদেশি বন্দিদের জন্য এই কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। সরকারি নির্দেশিকায় একে ‘অস্থায়ী ট্রানজিট সুবিধা’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এর কার্যপদ্ধতি নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে এগুলো আসলে ডিটেনশন সেন্টার বা আটক শিবিরের মতোই কাজ করবে কিনা।
৩০ দিনের সময়সীমা ও নাগরিকত্ব নির্ধারণ
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের এই হোল্ডিং সেন্টারগুলিতে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আটক ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব এবং যাবতীয় নথিপত্র যাচাই করা হবে। কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জেলাশাসক বা সমতুল্য পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের হাতে। মূলত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে এই কেন্দ্রগুলোকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন।
কার্যপদ্ধতি ও নির্বাসনের দ্রুত প্রক্রিয়া
হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে রাখা ব্যক্তিদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালে আপলোড করা হবে। শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এই অবৈধ অভিবাসীদের নির্বাসনের জন্য সরাসরি সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে রাজ্য পুলিশকে আর দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। রাজ্য পুলিশ অনুপ্রবেশকারীদের সরাসরি বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেবে এবং পরবর্তীতে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ‘বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ’ (বিজিবি)-এর সাথে সমন্বয় সাধন করবে। এই সরাসরি নির্বাসন ব্যবস্থার কারণেই বিশ্লেষকরা একে পরোক্ষভাবে ডিটেনশন সেন্টারের রূপ হিসেবেই দেখছেন।
আইনি জটিলতা ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার শরণার্থী এবং অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিতে চাইছে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ (CAA)-এর আওতার বাইরে থাকবেন, তাদের প্রত্যেককেই অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে গ্রেফতার করা হবে। পূর্বে আসামেও বিদেশি নাগরিকদের রাখার জন্য এমন ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে মানবাধিকার বিতর্ক ও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে ‘ট্রানজিট ক্যাম্পে’ রূপান্তরিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই হোল্ডিং সেন্টার চালুর সিদ্ধান্ত সীমান্ত সুরক্ষাকে কঠোর করলেও, তা আগামী দিনে আইনি ও মানবাধিকার ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।