‘সুখের পায়রাদের আটকাব না’, কালীঘাটের বৈঠকে বার্তা মমতার, আইনি লড়াইয়ে গড়লেন ৫ সদস্যের কমিটি

রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলে এক অভূতপূর্ব ভাঙন ও টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন পুরসভার কাউন্সিলর ও শীর্ষ নেতারা হয় পদত্যাগ করছেন, না হয় প্রকাশ্যে দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। এই কঠিন এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের রাশ শক্ত হাতে ধরতে এবার নিজেই ময়দানে নামলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার কালীঘাটে নিজের বাসভবন সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ে পুর কাউন্সিলরদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন তিনি। সেখানে দলবদলু ও ক্ষুব্ধ নেতাদের কড়া বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি আগামী দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন রণকৌশল স্থির করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
‘সুখের সময় অনেকেই ছিলেন, এখন ওরাই সুখের পায়রা’
বৈঠকে তৃণমূল নেত্রীর গলায় ধরা দিয়েছে কিছুটা অভিমানী অথচ অত্যন্ত দৃঢ় সুর। সাম্প্রতিক দলবদলের হিড়িক প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট বলেন, “তৃণমূলের সুখের সময় অনেকেই পাশে ছিলেন। এখন কঠিন পরিস্থিতি দেখে তাঁরা দল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এই ‘সুখের পায়রাদের’ আমি কোনোভাবেই আটকে রাখব না। যার ইচ্ছা চলে যেতে পারে, ওদের দলে রেখে কোনো লাভ নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, যারা সমস্ত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তাঁর ওপর আস্থা রেখে দলে টিকে থাকবেন, তাঁরাই হলেন দলের ‘আদর্শবান ও প্রকৃত কর্মী’। এই লড়াকু কর্মীদের নিয়েই তিনি নতুন করে সংগঠন সাজাবেন এবং বাংলার রাজনীতিতে আবার ঘুরে দাঁড়াবেন।
কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতি ও নজরে দমদম লোকসভা
এদিনের বৈঠকটি মূলত দমদম লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিধাননগর, বরানগর, দমদম, উত্তর দমদম ও দক্ষিণ দমদম পুরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে ডাকা হয়েছিল। বৈঠকে দমদম লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল সভাপতি মদন মিত্র এবং দমদমের প্রাক্তন বিধায়ক ব্রাত্য বসু উপস্থিত ছিলেন। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন উত্তর দমদম পুরসভার চেয়ারম্যান বিধান বিশ্বাস। যদিও তিনি পরে জানিয়েছেন যে, জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ থাকার কারণেই তিনি আসতে পারেননি।
মিথ্যা মামলার মোকাবিলায় ৫ সদস্যের বিশেষ কমিটি
বৈঠকে কাউন্সিলর ও নেতাদের একটি বড় অংশ অভিযোগ করেন যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূল কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে। কর্মীদের এই ভীতি দূর করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ দেন, “কেউ ভয় পাবেন না। মানসিকভাবে চাঙা থাকুন। যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি পথে লড়াই করুন এবং প্রতিবাদে রাস্তায় নামুন।”
দলীয় কর্মীদের এই সমস্ত আইনি জটিলতা ও মামলার দেখভাল করার জন্য বৈঠক থেকেই ৫ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কমিটিতে রয়েছেন:
১) মলয় ঘটক
২) চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য
৩) মদন মিত্র
৪) তাপস চট্টোপাধ্যায়
৫) সব্যসাচী দত্ত
ঈদ মিটলেই দিল্লি সফর ও আন্দোলনের রূপরেখা
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দলের নেতা-কর্মীদের ঘরছাড়াদের দ্রুত ঘরে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছেন নেত্রী। একই সাথে তিনি জানান, ঈদ মিটলেই দেশজুড়ে বড়সড় রাজনৈতিক আন্দোলনে নামতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ইতিমধ্যেই সেই কর্মসূচির রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে খুব শীঘ্রই তিনি দিল্লি সফরেও যাবেন বলে নেতাদের আভাস দিয়েছেন।
এক ঝলকে
- দলবদলুদের ‘সুখের পায়রা’ আখ্যা দিয়ে দল ছাড়লে কাউকে আটকানো হবে না বলে স্পষ্ট জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
- কালীঘাটের বৈঠকে কাউন্সিলরদের ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং ঘরছাড়াদের ঘরে ফেরানোর নির্দেশ দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
- দলীয় নেতা ও কর্মীদের মামলার বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতে মলয় ঘটক, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও মদন মিত্রদের নিয়ে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন।
- ঈদ উৎসব মিটলেই নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে রাস্তায় নামার প্রস্তুতি এবং আগামী দিনে দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা তৃণমূল নেত্রীর।