অবশেষে পুলিশের জালে ‘পলাতক’ বিডিও প্রশান্ত বর্মন!

অবশেষে পুলিশের জালে ‘পলাতক’ বিডিও প্রশান্ত বর্মন!

খাতায়-কলমে দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পলাতক থাকার পর, অবশেষে গ্রেফতার হলেন সল্টলেকের নামী স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মূল অভিযুক্ত তথা জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও (BDO) প্রশান্ত বর্মন। সোমবার রাতে নিউটাউনে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, পথচারীকে ধাক্কা এবং এরপর প্রকাশ্য রাস্তায় ‘দাদাগিরি’ ও হুমকি দিতে গিয়েই পুলিশের পাতা জালে ধরা পড়লেন এই বিতর্কিত সরকারি আধিকারিক।

সোমবার রাতে নিউটাউনের ঘটনা ও গ্রেফতারি

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত সাড়ে দশটা নাগাদ নিউটাউনের সারচী সিগন্যালের সামনে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন। মদের ঘোরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি এক বাইক আরোহীকে সজোরে ধাক্কা মারেন। ধাক্কার তীব্রতায় বাইকচালক ছিটকে পড়েন এবং পায়ে গুরুতর চোট পান।

স্থানীয় এক যুবক তৎক্ষণাৎ প্রশান্তর গাড়িটি আটকে দাঁড় করালে শুরু হয় তুমুল বচসা। অভিযোগ, নিজের অপরাধ স্বীকার করা তো দূরস্ত, উল্টে গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত অহংকারীভাবে স্থানীয়দের হুমকি ও গালিগালাজ দিতে শুরু করেন তিনি। এক যুবক এই ঘটনার ভিডিও রেকর্ডিং করতে গেলে তাঁর ওপরেও চড়াও হন এই ‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ আধিকারিক, যার ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয়রা খবর দিলে ইকো পার্ক থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে প্রথমে তাঁকে আটক করে এবং পরে গ্রেফতার করে।

‘দাগী’ বিডিও প্রশান্ত বর্মনের মারাত্মক সব কীর্তি

প্রশান্ত বর্মনের অতীত রেকর্ড এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি কোনো পেশাদার অপরাধীর চেয়ে কম নয়। প্রশাসনিক পদকে হাতিয়ার করে তাঁর বিরুদ্ধে খুন, জালিয়াতি এবং গুন্ডামির একাধিক মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে:

  • স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন খাঁ খুন মামলা: ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর যাত্রাগাছির খালপাড় এলাকা থেকে সল্টলেকের স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন খাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃতের পরিবার সরাসরি বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ তোলে। অভিযোগ, তৎকালীন তৃণমূল সরকারের রাজনৈতিক প্রচ্ছন্ন মদত থাকায় পুলিশ দীর্ঘদিন তাঁর টিকিটি ছুঁতে পারেনি।
  • সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য: আদালতের কড়া নির্দেশে তদন্ত গতি পেলে মামলাটি কলকাতা হাইকোর্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। গত জানুয়ারি মাসে দেশের সর্বোচ্চ আদালত (Supreme Court) প্রশান্ত বর্মনকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেও তিনি তা অগ্রাহ্য করে বেপাত্তা হয়ে যান।
  • সাদা খাতা জমা দিয়ে বিডিও পদের জালিয়াতি: প্রশান্ত বর্মনের চাকরি পাওয়া নিয়েও রয়েছে চরম বিতর্ক। অভিযোগ, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় সম্পূর্ণ ‘সাদা খাতা’ জমা দিয়েও মোটা টাকার বিনিময়ে ও রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি বিডিও-র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ পেয়েছিলেন।
  • পদ থেকে অপসারণ: খুনের মামলায় নাম জড়ানো এবং আদালতের নির্দেশের পর তৎকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রাজগঞ্জের বিডিও পদ থেকে তাঁকে অপসারিত ও সাসপেন্ড করে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যিনি এতদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন, সোমবার রাতের মদ্যপ দাদাগিরিই তাঁর সেই পলাতক জীবনের অবসান ঘটাল। এই ‘দাগী’ বিডিও-র গ্রেফতারির পর স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের তদন্ত ও তাঁর নিয়োগ দুর্নীতি মামলা এবার দ্রুত গতি পাবে বলে আশা করছে ওয়াকিবহাল মহল।

এক ঝলকে

  • সল্টলেকের স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের মূল অভিযুক্ত, রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন অবশেষে গ্রেফতার।
  • সোমবার রাতে নিউটাউনে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে বাইক আরোহীকে ধাক্কা এবং পরে স্থানীয়দের হুমকি দিতে গিয়ে পাকড়াও হন তিনি।
  • ২০২৫ সালের স্বপন খাঁ খুনের মামলায় নাম জড়ানোর পর সুপ্রিম কোর্ট আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেও এতদিন পলাতক ছিলেন প্রশান্ত।
  • ওএমআর শিট বা পরীক্ষার খাতা সাদা রেখেও রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি বিডিও হয়েছিলেন বলে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *