“রক্তের শিবিরে ড্রাকুলা!” ট্রাম্পের মিষ্টি কথায় কি সত্যিই ভুলবে ভারত?

ট্রাম্পের মিষ্টি কথার আড়ালে লুকানো বাণিজ্যিক স্বার্থ কি ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে ওয়াশিংটন থেকে সরাসরি ফোন কলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতীয় জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি দাবি করেছেন, ভারত তার ওপর শতভাগ ভরসা রাখতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মার্কো রুবিওর চার দিনের নয়াদিল্লি সফরের মধ্যেই এই বিশেষ ফোনালাপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে আপাতদৃষ্টিতে এই সম্পর্ককে যতটা মধুর মনে হচ্ছে, পর্দার আড়ালে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ‘লেনদেনের নীতি’ বা ট্রানজেকশনাল পলিসি ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সামনে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প ভারতকে কেবল এক বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখছেন।
কঠিন বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত ও নীতিগত সংঘাত
ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখে বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বারবার ভারতের কোর স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার অপরাধে ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ জরিমানা এবং আরও ২৫ प्रतिशत রেসিপ্রোকাল শুল্কসহ মোট ৫০ শতাংশের এক ভারী ট্যারিফ চাপিয়ে দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। অতি সম্প্রতি ২০२৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির মাধ্যমে তা কিছুটা শিথিল করার ইঙ্গিত মিললেও মার্কিন কঠোর মনোভাব স্পষ্ট। এর পাশাপাশি ২০२৬ সালের মে মাসে এইচ-ওয়ানবি (H1-B) ভিসার নিয়ম ও ফি এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দেওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত ভারতীয় আইটি পেশাদাররা চরম বিপাকে পড়েছেন। একই মাসে ট্রাম্পের চীন সফর এবং বেইজিংয়ের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমার পরোক্ষ প্রভাব ভারতের অভ্যন্তরীণ ইলেকট্রনিক্স শিল্পের বাজারকেও বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূরাজনীতি ও ভারতের প্রতিবেশী বলয়ে দ্বিমুখী অবস্থান
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটনের বর্তমান ভূমিকা নয়াদিল্লির অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য নীতির স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন আব্রাহাম চুক্তিতে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, যা পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকার বিশেষ নরম মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। নয়াদিল্লির আপত্তি সত্ত্বেও ইসলামাবাদকে কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা এবং ভারত-পাকিস্তানকে একই পাল্লায় মাপা ভারতের দীর্ঘদিনের সীমান্ত নীতির পরিপন্থী। একই সাথে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন পূর্ববর্তী জো বাইডেন আমলের অস্থিতিশীল নীতিগুলোকেই বজায় রেখেছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। এমনকি ইউক্রেন সংকটের প্রেক্ষাপটে ভারতের রুশ তেল আমদানির ওপর মার্কিন চাপ তৈরি করা হয়েছিল, যা বর্তমানে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের এই বাণিজ্যিক মানসিকতার কারণে ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক ধারণা ৮৩ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৫৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। কোয়াড (Quad) জোটের কার্যকারিতা নিয়ে ট্রাম্পের উদাসীনতা এবং কোয়াডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ধীরগতি এই সম্পর্কের পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, আমেরিকার কেবল মিষ্টি কথায় না ভুলে ভারতের উচিত নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের সামারিক ও কৌশলগত স্বাতীতায় অবিচল থাকা। ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও চুক্তির ক্ষেত্রে ভারতকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলার কৌশল নিতে হবে।
এক ঝলকে
- ওয়াশিংটনে মার্কিন স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ট্রাম্প পিএম মোদীর প্রশংসা করে ভারতকে ১০০ শতাংশ ভরসা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন।
- ট্রাম্পের এই বন্ধুত্বের বার্তার সমান্তরালে আমেরিকার কঠোর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং শুল্ক নীতি ভারতের আইটি সেক্টর ও রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
- পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকার নতুন করে নরম মনোভাব এবং আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত করার চেষ্টা ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।
- ভূরাজনৈতিক ও জ্বালানি সুরক্ষার স্বার্থে ভারতকে মার্কিন মিষ্টি কথার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদার করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।