৪ তলার অনুমতিতে কীভাবে ৬-৭ তলার বেআইনি বহুতল? নেপথ্যের ‘আসল খেলা’ ফাঁস করলেন দুঁদে প্রোমোটার

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি (BJP) সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে জোরদার ‘বুলডোজার অ্যাকশন’। বেলেঘাটা, তিলজলা, কসবা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক অবৈধ বহুতল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে— এতদিন ধরে প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে চলছিল এই ‘অবৈধ রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য’? কীভাবে ৪ তলার অনুমতি নিয়ে দেদার ৬ থেকে ৭ তলা ফ্ল্যাটবাড়ি উঠে যাচ্ছিল?
এই চাঞ্চল্যকর বিষয়ের নেপথ্য কাহিনী এবং ভেতরের আসল সত্যটি ফাঁস করেছেন কলকাতার উপকণ্ঠের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুঁদে প্রোমোটার।
১. আকাশছোঁয়া জমি ও নির্মাণ খরচ
ওই প্রোমোটারের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে কলকাতার লাগোয়া ভালো এলাকায় ব্যবসা করতে গেলে খরচের অঙ্কটা বিপুল:
- জমি কেনা: মাত্র ২ কাঠা জমি কিনতেই প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়।
- নির্মাণ খরচ: এর পর ৪-৫ তলার একটি ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করতে আরও ৬৫ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা খরচ হয়। যদি বিল্ডিংটি একটু আধুনিক বা স্টাইলিশ করা হয়, তবে খরচ ৮০ লক্ষ টাকা ছুঁয়ে যায়।
- অতিরিক্ত খরচ: পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন আবাসন করার সময় বাড়ি মালিককে ১-১.৫ বছর ধরে অন্য জায়গায় রাখার ভাড়াও প্রোমোটারকে বহন করতে হয়।
২. মালিকের ভাগ ও কমে আসা মুনাফা
একটি মাঝারি মানের বহুতলের সব ফ্ল্যাট বিক্রি করে সাধারণত ২ কোটি টাকার মতো আয় হয়। কিন্তু এই পুরো টাকা প্রোমোটার পান না। বেশিরভাগ প্রকল্পই জমির মালিকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে (Joint Venture) হয়। জমির মালিক নগদের পাশাপাশি সবচেয়ে ভালো ও দক্ষিণমুখী ফ্ল্যাটগুলো নিজের জন্য রেখে দেন। ফলে সমস্ত খরচ ও মালিকের ভাগ দেওয়ার পর প্রোমোটারের হাতে মুনাফা থাকে মাত্র ৩০ লক্ষ টাকার মতো।
৩. রাজনৈতিক তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজ
প্রোমোটারের দাবি অনুযায়ী, আসল সমস্যার শুরু হয় এখানেই। ব্যবসার লাভের একটা বড় অংশ চলে যায় রাজনৈতিক মহলের পকেটে।
“অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালীরাও বড় অঙ্কের টাকা দাবি করেন। সেই টাকা দেওয়ার পরে প্রোমোটারের নিজস্ব লাভের পরিমাণ আরও কমে যায়।”
অতিরিক্ত লাভের লোভ এবং বেআইনি পথের সন্ধান
রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের কাটমানি দেওয়ার পর নিজেদের পকেট ভরতে বহু প্রোমোটার বাধ্য হয়েই বেআইনি পথ বেছে নেন। তাঁরা মূলত দুটি উপায়ে কারচুপি করেন:
- অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা: মিউনিসিপ্যালিটি বা পুরসভা থেকে ৪ তলার অনুমোদন (Sanction) নিয়ে, ক্ষমতার জোরে তার ওপর আরও ১ বা ২ টি অতিরিক্ত তলা (Floor) তুলে দেওয়া হয়।
- খোলা জায়গা বুজিয়ে কার্পেট এরিয়া বৃদ্ধি: নিয়ম অনুযায়ী বিল্ডিংয়ের চারপাশে যে পরিমাণ খোলা জায়গা ছাড়ার কথা, তা না ছেড়ে পুরো জমিতেই কনস্ট্রাকশন করে দেওয়া হয়। এর ফলে স্কোয়ার ফিট (Square Feet) বেড়ে যায় এবং বেশি টাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোটা যায়।
প্রোমোটারের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, “টাকা ঠিক জায়গায় পৌঁছে গেলে এতদিন রাজনৈতিক মদত পাওয়া যেত। ফলে কোনো বাধা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে বুক ফুলিয়ে চলেছে এই বেআইনি নির্মাণ।”
শুধু বুলডোজারে কি মিটবে সমস্যা?
বর্তমানে শুভেন্দু সরকারের এই বুলডোজার অভিযানে প্রোমোটার মহলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তবে আবাসন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিল্ডিং ভাঙলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এই অবৈধ রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্যের পেছনে যে গভীর আর্থিক ও রাজনৈতিক যোগসাজশ (Nexus) রয়েছে, তার উৎস মূলে আঘাত করা প্রয়োজন।
এক ঝলকে
- ৪ তলার পারমিশনে ৬-৭ তলা তৈরির নেপথ্যে প্রোমোটার, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের গভীর আঁতাত ফাঁস।
- জমি ও নির্মাণ খরচের পর স্থানীয় নেতাদের মোটা অঙ্কের কাটমানি দেওয়ায় প্রোমোটারদের লাভের অঙ্ক কমে যেত।
- সেই ঘাটতি পূরণ ও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে নিয়মের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত তলা তৈরি ও কার্পেট এরিয়া বাড়ানোর খেলা চলত।
- রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেলেঘাটা, তিলজলা ও কসবায় শুভেন্দু সরকারের ‘বুলডোজার অ্যাকশনে’ কাঁপছে প্রোমোটার মহল।