স্বপ্নপূরণের পরেই চিরবিদায়, এভারেস্টের বুকেই শিবের আশ্রয়ে থেকে গেলেন অরুণ

স্বপ্নপূরণের পরেই চিরবিদায়, এভারেস্টের বুকেই শিবের আশ্রয়ে থেকে গেলেন অরুণ

বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করার আজন্ম লালিত স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের আনন্দ নিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না। মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ফেরার পথে চিরতরে হারিয়ে গেলেন ৫৩ বছর বয়সি অভিজ্ঞ পর্বতারোহী অরুণ কুমার তিওয়ারি। তবে প্রথাগত শেষকৃত্যের পথে না হেঁটে তাঁর পরিবার এক ব্যতিক্রমী ও আবেগঘন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাহাড়প্রেমী অরুণের নশ্বর দেহ আর সমতলে ফিরিয়ে আনা হবে না, তিনি থেকে যাবেন তাঁর ভালোবাসার হিমালয়ের কোলেই।

হিলারি স্টেপে স্বপ্নভঙ্গ ও মৃত্যুর কারণ

বিগত সপ্তাহে এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের জাতীয় পতাকা উড়িয়েছিলেন অরুণ। কিন্তু শৃঙ্গ থেকে নেমে আসার সময় তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ বোধ করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চরম উচ্চতায় অক্সিজেনের তীব্র সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ডেথ জোনের অন্তর্গত ‘হিলারি স্টেপ’ নামক অত্যন্ত বিপজ্জনক অংশে এসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই পর্বতারোহী। সঙ্গে চারজন নেপালি শেরপা থাকা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এর আগে মাউন্ট এলব্রুস, দেনালি এবং আকোনকাগুয়ার মতো কঠিন শৃঙ্গ জয় করলেও, গত বছর এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে অসুস্থতার জন্য ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে। এবার দ্বিতীয় চেষ্টায় স্বপ্ন সফল হলেও তা রূপ নিল চরম ট্র্যাজেডিতে।

দুর্গম পরিস্থিতি ও পরিবারের অনন্য সিদ্ধান্ত

এভারেস্টের চূড়ার কাছাকাছি এলাকা থেকে কোনো নশ্বর দেহ নিচে নামিয়ে আনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে উদ্ধারকারীদের জীবনও বিপন্ন হতে পারে। অরুণের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেহ উদ্ধার করতে গেলে তা আরও ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর পাশাপাশি, প্রয়াত অরুণ ব্যক্তিগত জীবনে গভীর শিবভক্ত ছিলেন। তাঁর পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস, হিমালয় হলো স্বয়ং দেবতা শিবের বাসস্থান। তাই এই পর্বত আরোহীকে প্রকৃতির বুকেই সমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি চিরকাল তাঁর প্রিয় ঈশ্বরের আশ্রয়ে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন।

পর্বতারোহণে বাড়তে থাকা ঝুঁকি ও প্রভাব

অরুণের ট্র্যাজিক মৃত্যুর পাশাপাশি এই অভিযানে সন্দীপ আরে নামে তাঁর আরেক সহযাত্রীও অসুস্থ হয়ে ক্যাম্প থ্রি-র কাছে প্রাণ হারিয়েছেন, যার দেহ অবশ্য হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। একই অভিযানে দুই পর্বতারোহীর এই পরিণতি উচ্চ শৃঙ্গ অভিযানের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে এনেছে। চরম উচ্চতায় তীব্র ঠাণ্ডা, আকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তন এবং হাইপোক্সিয়ার (অক্সিজেনের অভাব) মতো জীবনঘাতী ঝুঁকিগুলো আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও পর্বতারোহীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের ঘটনা আগামী দিনে এভারেস্ট অভিযানের সময় পর্বতারোহীদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই এবং উদ্ধারকাজের নিরাপত্তাজনিত নিয়মাবলিকে আরও কঠোর করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *