১১ পাতার অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম প্রকাশ, তিন হাজার টাকা পেতে জমা দিতে হবে পরিবারের সব খুঁটিনাটি

নারীদের স্বাবলম্বী করতে এবং প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিতে রাজ্য সরকারের বহুল চর্চিত ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আবেদনপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। বুধবার নবান্নে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারিভাবে এই প্রকল্পের ১১ পাতার দীর্ঘ ফর্মটি প্রকাশ করেন। নির্দিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইট থেকে এই আবেদনপত্র সংগ্রহ করা যাচ্ছে। তবে এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে আবেদনকারী ও তাঁর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জমি-জায়গা থেকে শুরু করে শিক্ষা, পেশা ও ব্যাঙ্কের যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য জমা দিতে হবে।
ফর্ম প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১ জুন থেকে আগামী তিন মাস পর্যন্ত এই ফর্ম পূরণের প্রক্রিয়া চলবে। অনলাইন এবং অফলাইন— দুই মাধ্যমেই আবেদন করা যাবে। দীর্ঘ এই ফর্ম পূরণে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে সরকারি আধিকারিকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহায়তা করবেন। এমনকি বিধায়কদেরও নিজ নিজ এলাকায় এই বিষয়ে দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, এই ফর্মের মাধ্যমে নাগরিকদের পরিবার সংক্রান্ত একটি সামগ্রিক ডেটাবেস তৈরি করছে সরকার, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা হবে।
নথির পাহাড় ও তথ্যের কড়াকড়ি
১১ পাতার এই দীর্ঘ আবেদনপত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে নজিরবিহীন কড়াকড়ি করা হয়েছে। ফর্মের প্রথম অংশেই পরিবারের প্রধানের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর এবং পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিবরণ চাওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক সকল সদস্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও ভোটার কার্ডের নম্বর, বিধানসভা এবং পার্ট নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ডিজিটাল রেশন কার্ডের বিশদ বিবরণও ফর্মে দিতে হবে।
যোজনার তৃতীয় পর্যায়ে আবেদনকারীর সম্পত্তির খতিয়ান চাওয়া হয়েছে। পরিবারের নিজস্ব পাকা বাড়ি রয়েছে কি না, মোট জমির পরিমাণ কত, মিউটেশন ও রেজিস্ট্রেশনের সঠিক তথ্য কী— তা নথিসহ উল্লেখ করতে হবে। এমনকি পরিবারের কোনো সদস্যের চার চাকার গাড়ি আছে কি না, বা পরিবারের কেউ আয়কর দেন কি না তা নিশ্চিত করতে প্যান কার্ডের নম্বর ও পেশার বিবরণ চাওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবারের বার্ষিক আয়, শিশুদের স্কুলের নাম, টিকাকরণের তথ্য এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্রও আবেদনের সঙ্গে জমা দিতে হবে। সিএএ-তে নাগরিকত্বের আবেদন বা স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ডের মতো অন্যান্য সরকারি সুবিধার বিবরণও এই ফর্মে জানতে চেয়েছে সরকার।
জটিলতার আশঙ্কা ও সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই পদক্ষেপের মূল কারণ হলো প্রকৃত অভাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং ভুয়া আবেদনকারীদের বাদ দেওয়া। এই বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে রাজ্য সরকারের কাছে নাগরিকদের একটি নিঁখুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র তৈরি হবে, যা ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে সাহায্য করবে।
তবে এই দীর্ঘ ও জটিল ফর্ম সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজে থেকে এত রকমের নথিপত্র গুছিয়ে সঠিকভাবে ফর্ম পূরণ করা বেশ কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে জমির মিউটেশন বা প্রাতিষ্ঠানিক নথির অভাবে যোগ্য ব্যক্তিরা সমস্যায় পড়তে পারেন। ফলে মাঠপর্যায়ে সরকারি কর্মচারীদের সক্রিয় ভূমিকা এবং নিবিড় সহায়তার ওপরেই এই যোজনার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে।