পাহাড়ের জট কাটাতে নবান্নে ঐতিহাসিক বৈঠক, ৩ লক্ষ কোটির প্যাকেজ ও ৩ পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগ শুভেন্দুর

পাহাড়ের জট কাটাতে নবান্নে ঐতিহাসিক বৈঠক, ৩ লক্ষ কোটির প্যাকেজ ও ৩ পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগ শুভেন্দুর

দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতি ও প্রশাসনিক মহলে এক বড়সড় পটপরিবর্তন ঘটে গেল। শুক্রবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার শীর্ষ নেতা বিমল গুরুং এবং রোশন গিরির এক উচ্চপর্যায়ের ম্যারাথন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পাহাড়ের হেভিওয়েট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পর দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক খোলনলচে বদলে ফেলতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাহাড়ের আমজনতার নাগরিক পরিষেবা যাতে কোনো অবস্থাতেই থমকে না যায়, তা নিশ্চিত করতে কালিম্পং, কার্শিয়াং এবং মিরিক—এই তিন পুরসভায় আপাতত প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তাকে পাশে রেখে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, বিমল গুরুং ও রোশন গিরিদের দাবিকে পূর্ণ মান্যতা দিয়ে পাহাড়ে উন্নয়নের সমস্ত জট কেটে কাজের রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া হলো।

৩ লক্ষ কোটির বাম্পার প্যাকেজ ও জিটিএ-র সমালোচনা

পার্বত্য অঞ্চলের ভৌত পরিকাঠামো ও সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাহাড়ের বিশেষ প্যাকেজ বাবদ এক ধাক্কায় মোট ৩ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করার ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছেন। এই বিপুল অর্থ পরিকাঠামোগত রূপান্তরে গতি আনবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA)-এর বিগত কাজের খতিয়ান নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্বতন ব্যবস্থার দিকে আঙুল তুলে তিনি ক্ষোভের সুরে জানান, প্রতি অর্থবর্ষেই পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য মোটা অর্থ বরাদ্দ করা হলেও জিটিএ কাজ করতে স্রেফ ব্যর্থ হয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটাতে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, জিটিএ-র প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি শামা পারভিন স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদদের সঙ্গে সার্বিক সমন্বয় রেখে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সমস্ত উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে সিবিআই তদন্তের জটমুক্তি

এই বৈঠক থেকেই পাহাড়ের শিক্ষক নিয়োগের মেগা কেলেঙ্কারি নিয়ে বড় পদক্ষেপের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। জানা গেছে, প্রায় ৪০০-রও বেশি শিক্ষককে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল। এই মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিলেও, তৎকালীন তৃণমূল সরকার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে স্থগিতাদেশ জারি করে রেখেছিল। নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার এই মামলা থেকে এখন পুরোপুরি বেরিয়ে আসবে এবং সেই অনুযায়ী ইতিমধ্যে মুখ্যসচিবকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে পাহাড়ে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকড় খুঁজতে সিবিআই-এর সামনে আর কোনো আইনি বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা রইল না। উল্লেখ্য, এই নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি পাহাড়ের প্রভাবশালী নেতা বিনয় তামাং এবং তৃণমূল যুব নেতা তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যের বিরুদ্ধেও জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রশাসনিক স্থবিরতা, জিটিএ-র ব্যর্থতা এবং নাগরিক পরিষেবার বেহাল দশা দূর করতেই রাজ্য সরকার এই জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। তিন পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগের ফলে স্থানীয় পৌর পরিষেবা গতিশীল হবে এবং ৩ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক প্যাকেজ পাহাড়ের ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ও পরিকাঠামোয় নতুন জোয়ার আনবে। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনি জটিলতা থেকে রাজ্য সরকার সরে দাঁড়ানোয় শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে সিবিআই তদন্তের রাস্তা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হলো, যা পাহাড়ের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অভিযুক্তদের ওপর প্রবল চাপ তৈরি করবে এবং স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *