মৃত্যুর প্ররোচনা দিয়ে বিশ্বজুড়ে বিষের কারবার, কানাডায় ভয়ংকর চক্রের মূলহোতা দোষী সাব্যস্ত

বিশ্বজুড়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও বিষাদগ্রস্ত মানুষকে টার্গেট করে আত্মহত্যার উসকানি দেওয়ার এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক চক্রের পর্দাফাঁস করেছে কানাডা পুলিশ। ইন্টারনেটের অন্ধকার জগৎ ব্যবহার করে পৃথিবীর ৪১টি দেশে মারণ বিষ সরবরাহ করার এই নারকীয় ব্যবসায় জড়িয়ে রয়েছে কেন্নেথ ল নামের এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের নাম। দীর্ঘ তদন্তের পর অবশেষে কানাডার আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে এই অপরাধী, যার পাঠানো সুইসাইড কিটের কারণে বিশ্বজুড়ে ১৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনলাইন আড়ালে বিষাদের ফাঁদ
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কেন্নেথ ল একাধিক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে অবসাদগ্রস্ত মানুষদের খুঁজে বের করত। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া এই ব্যক্তিদের কাউন্সিলিং করার নামে প্রথমে বন্ধুত্ব পাতাত সে এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তাদের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিত। এরপর বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো মারণ বিষ সোডিয়াম নাইট্রাইটসহ আত্মহত্যার বিভিন্ন সরঞ্জাম। শুধু বিষ সরবরাহ করাই নয়, কীভাবে তা ব্যবহার করে নিজের জীবন শেষ করা যাবে, সেই বিষয়েও নিখুঁত পরামর্শ দিত এই চক্রের মূলহোতা।
আন্তর্জাতিক বিস্তার ও মৃত্যুর মিছিল
এই মারণ ব্যবসার জাল আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ডসহ ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় ৪১টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। অপরাধী কেন্নেথ বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০০ জনের কাছে এই ভয়ংকর ‘সুইসাইড কিট’ পাঠিয়েছিল বলে প্রমাণ পেয়েছেন তদন্তকারীরা। এই বিষের করাল গ্রাসে ইতিমধ্যেই দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যার মধ্যে শুধুমাত্র ব্রিটেনেই অন্তত ৮৮ জনের আত্মহত্যার সাথে কেন্নেথের সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।
আইনি পরিণতি ও সম্ভাব্য প্রভাব
২০২৩ সালে এই ভয়ংকর কারবারির খোঁজ পেয়ে কানাডা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১৪ জনকে খুনের অভিযোগে মামলা করা হলেও আইনি জটিলতায় তা আটকে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত গত ২৯ মে কানাডার আদালতে কেন্নেথ ল নিজের মুখে স্বীকার করেছে যে সে ১৪ জন ব্যক্তির আত্মহত্যায় সরাসরি সহায়তা ও প্ররোচনা দিয়েছিল। দেশটির আইন অনুযায়ী এই অপরাধের জন্য তার সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এই ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী অনলাইন নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় ধাক্কা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট দুনিয়ায় মারণ উপকরণের সহজলভ্যতা এবং ভুয়ো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দুর্বল চিত্তের মানুষদের ফাঁদে ফেলার এই প্রবণতা রুখতে আন্তর্জাতিক স্তরে কঠোর নজরদারি ও সাইবার আইন জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।