মমতাকেই নেত্রী রেখে স্পিকারের দরবারে ৫৮ বিদ্রোহী, এবার কি তবে তৃণমূলের ‘মালিকানা’ বদল!

মমতাকেই নেত্রী রেখে স্পিকারের দরবারে ৫৮ বিদ্রোহী, এবার কি তবে তৃণমূলের ‘মালিকানা’ বদল!

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে দীর্ঘদিনের চাপা অসন্তোষ অবশেষে প্রকাশ্য মহাবিদ্রোহের রূপ নিল। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বোসের কাছে ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সই করা চিঠি জমা পড়েছে। রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে এই চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই সুপ্রিমো বা দলনেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিধানসভায় নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে দলের পরিষদীয় নেতা তথা বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করেছেন বিদ্রোহীরা। ফলে দল কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়ে এখন চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

অভিষেকের উত্থান বনাম আদি বনাম নব্য সংঘাত

এই নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের নেপথ্যে রয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে বহু বর্ষীয়ান নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, পরবর্তী সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত রাজনৈতিক উত্থান ও দলের ওপর তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য আদি শিবিরের অনেককেই ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাবের চিঠিতে সই করা নিয়ে তীব্র বিতর্ক। সই কাণ্ডে মুখ খুলে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেই দলের চাবিকাঠি নিজেদের হাতে নিতে ‘পাওয়ার গেম’-এ নামেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা। বিধানসভায় আইনি স্বীকৃতি পেতে মোট জেতা আসনের দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৫২ জন বিধায়কের সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। দফায় দফায় বৈঠকের পর লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি, অর্থাৎ ৫৮ জন বিধায়ককে নিজেদের ছাতার তলায় এনে সেই শক্তি প্রদর্শনে সফল হয়েছেন ঋতব্রত-সন্দীপন জুটি।

আইনি কৌশল ও ভবিষ্যৎ প্রভাব

বিদ্রোহী বিধায়করা মমতাকে দলনেত্রী পদে রেখেই নতুন পরিষদীয় দল গঠনের যে কৌশল নিয়েছেন, তার পেছনে গভীর আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম সামনে রাখলে দলত্যাগ বিরোধী আইনের কঠোর গেরো এড়ানো সহজ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের সেন্টিমেন্ট ধরে রেখে দলের রাশ নিজেদের হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় চাল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার পাশাপাশি উপ দলনেতা হিসেবে সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান ও শিউলি সাহা এবং মুখ্য সচেতক হিসেবে আখরুজ্জামানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

এই ঘটনার ফলে রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বোসের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। স্পিকারের সবুজ সংকেত মিললে বিধানসভায় তৃণমূলের প্রাতিষ্ঠানিক ‘মালিকানা’ বা নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাবে, যা মূল শাসক শিবিরের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। অন্যদিকে, এই ভাঙনের ফলে জেলা স্তরে ও সাধারণ কর্মীদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আদতে ‘আসল তৃণমূল’ কারা, তা নির্ধারণের লড়াই এখন রাজপথ ছাড়িয়ে বিধানসভার আইনি দোরগোড়ায় এসে ঠেকেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *