দল হাতছাড়া মমতার, নয়া বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটে গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে চলে গেল তাঁরই দলের পরিষদীয় নিয়ন্ত্রণ। ৫৮ জন বিধায়কের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিয়ে বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পেলেন দল থেকে বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পিকারের এই মান্যতা দেওয়ার পর রাজ্যের রাজনীতিতে ‘নতুন তৃণমূল’ গঠনের জল্পনা এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে গেল।
বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিজের নতুন ঘরে বসেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেন যে, তৃণমূলের রাশ এখন তাঁরই হাতে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক লড়াইকে সম্মান জানিয়ে তাঁকে দলের ‘পরামর্শদাতা’ পদের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, দলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে ঋতব্রত স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই নতুন পরিষদীয় দলে অভিষেকের কোনো ভূমিকা বা গুরুত্ব নেই।
পরিষদীয় সমীকরণ ও নতুন নেতৃত্বের উত্থান
দলবিরোধী কাজের জন্য ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে আগেই দল থেকে বহিষ্কার করেছিল তৃণমূল নেতৃত্ব। কিন্তু সেই বহিষ্কৃত নেতার নেতৃত্বেই সিংহভাগ বিধায়ক স্পিকারের দ্বারস্থ হন। পরিষদীয় রীতিনীতি মেনে ৫৮ জন বিধায়কের সম্মতির চিঠি পাওয়ার পর স্পিকার বিদ্রোহী অংশটিকেই আসল তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে মান্যতা দিয়েছেন।
নতুন এই সাংগঠনিক কাঠামোয় ঋতব্রতর পাশাপাশি বড় দায়িত্ব পেয়েছেন অন্য বিধায়করাও। বিধানসভায় মুখ্য সচেতক (চিফ হুইপ) করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। এর পাশাপাশি দলের ডেপুটি লিডার বা উপনেতা করা হয়েছে চারজনকে— জাভেদ আহমেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা এবং সন্দীপন সাহা। এই নতুন কমিটি গঠনের মাধ্যমে অভিষেক ও মমতা শিবিরের কর্তৃত্বকে পুরোপুরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
এই নজিরবিহীন ভাঙনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা এবং জনসংযোগের অভাবকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিদ্রোহীরা।
এই ঘটনার প্রভাব রাজ্যের রাজনীতিতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। প্রথমত, বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল হিসেবে এখন বিজেপির পাশাপাশি তৃণমূলেরই একটি বড় অংশ কাজ করবে, যা শাসক শিবিরের ওপর চাপ বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক একাধিপত্যে আঘাত লাগায় দলের অন্দরে সাংগঠনিক ভাঙন আরও চওড়া হতে পারে। সর্বাগ্রে, শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ‘নতুন তৃণমূল’ শিবিরের বৈঠক এবং বোঝাপড়ার যে ইঙ্গিত মিলছে, তা আগামী দিনে রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।