আইসল্যান্ডের হিমবাহ গললে ডুবতে পারে কলকাতা, আন্তর্জাতিক সেমিনারে চরম হুঁশিয়ারি রাষ্ট্রদূতের

ভৌগোলিক দূরত্ব হাজার মাইলের হলেও প্রকৃতির মার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অমোঘ সত্য আজ বিশ্বমঞ্চের দুই ভিন্ন প্রান্তকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। সুদূর উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত রাষ্ট্র আইসল্যান্ডের পরিবেশগত বিপর্যয় কীভাবে গঙ্গার তীরে অবস্থিত মেগাসিটি কলকাতার অস্তিত্বকে সরাসরি বিপন্ন করে তুলতে পারে, সেই ভয়ানক বাস্তবতাই এবার উঠে এল খোদ কলকাতার বুকেই। বুধবার কলকাতার সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির (SNU) ঠাসা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই বিস্ফোরক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দাবি করেন ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে নিযুক্ত আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত বেনেডিক্ট হোসকুল্ডসন।
গাম্ভীর্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর সত্যম রায়চৌধুরী, প্রো-চ্যান্সেলর অধ্যাপক (ডঃ) ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়-সহ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনেরা। ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে হিমাচল বা লাদাখের পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা থেকে শুরু করে কলকাতার জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা— সব মিলিয়ে জলবায়ুর এই যুদ্ধ এখন আর কোনো দূরবর্তী তত্ত্ব নয়, বরং এক রূঢ় রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।
এক জলবায়ু এক সংকট এবং কলকাতার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
উপস্থিত শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রাষ্ট্রদূত হোসকুল্ডসন স্পষ্ট জানান যে, আইসল্যান্ডের জলবায়ুগত পরিবর্তনের সাথে কলকাতার ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। গোটা বিশ্বের গড় তাপমাত্রার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে আইসল্যান্ড। ২০১৯ সালে সেখানকার হাজার বছরের প্রাচীন হিমবাহ ‘ওকজোকুল’ (Okjökull)-কে সরকারিভাবে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, যা সুদূর উত্তরের পরিবেশগত ট্র্যাজেডিকে বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করে।
হিমবাহ কেবল আইসল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, তা সে দেশের সংস্কৃতি, জলসম্পদ এবং economies বা অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এই গলে যাওয়া হিমবাহের জলই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি করছে। যেহেতু কলকাতা গঙ্গার তীরে অবস্থিত এবং পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল ও জলবায়ুগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ শহর, তাই আইসল্যান্ডের বরফ গলার সরাসরি কুপ্রভাব পড়বে এই শহরের ওপর। জলস্তর বাড়লে কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে, আইসল্যান্ডের পরিবেশ রক্ষা পাওয়ার ওপরেই কার্যত নির্ভর করছে কলকাতার ভবিষ্যৎ স্বার্থ।
প্রযুক্তির মেলবন্ধন ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদারী
তবে রাষ্ট্রদূত কেবল ভয়ের বার্তা শোনাননি, বরং সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। আইসল্যান্ড তাদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ১০০ শতাংশই ভূ-গর্ভস্থ তাপ (Geothermal) এবং জলবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন করে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে, বিশেষ করে লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং হিমালয়ের পাদদেশীয় সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলগুলিতে বিপুল পরিমাণ ভূ-তাপীয় শক্তি বা জিওথার্মাল সম্ভাবনার উৎস রয়েছে, যেখানে আইসল্যান্ড তাদের উন্নত প্রযুক্তি ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। এর পাশাপাশি কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসকে বাতাসে ছড়ানো থেকে রুখতে বিশেষ ‘কার্বন ক্যাপচারিং’ প্রযুক্তির কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যার মাধ্যমে সংগৃহীত কার্বনকে ব্যাসল্ট পাথরের গভীরে প্রবেশ করিয়ে খনিজ পদার্থে রূপান্তর করা সম্ভব।
ভারত ও আইসল্যান্ডের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত জানান, গত ১৪ বছরের আলোচনার পর আইসল্যান্ড এবং তার ‘ইএফটিএ’ (EFTA) সহযোগীরা ভারতের সাথে একটি যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি (TEPA) স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির মূল বিষয়গুলি— যেমন প্রযুক্তি হস্তান্তর, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি, টেকসই উন্নয়ন এবং ক্লিন এনার্জির মতো ক্ষেত্রগুলি সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির পঠনপাঠনের মূল বিষয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। ইউরোপের নর্ডিক দেশগুলি ভারতকে আগামী দশকের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং বিশ্ব সুরক্ষার অন্যতম প্রধান সমকক্ষ শক্তি হিসেবে গণ্য করে। অনুষ্ঠানের শেষে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে আইসল্যান্ডের এই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর সত্যম রায়চৌধুরী।