মৃত ব্যক্তির লোন, পরিবারের দায় কতটা এবং আইন কী বলছে, জেনে নিন বিস্তারিত

পরিবারের কোনো উপার্জনক্ষম সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে এমনিতেই স্বজনরা চরম শোকের সাগরে ডুবে যান। তার ওপর যদি সেই মৃত ব্যক্তির নামে ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ বকেয়া থাকে, তবে পরিবারের ওপর মানসিক চাপ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। বন্ধক রাখা হোম লোন, পার্সোনাল লোন কিংবা ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিল শোধ করার জন্য প্রায়শই ব্যাংক থেকে নোটিশ বা কল আসে। এই পরিস্থিতিতে অনেক সময় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার আগেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তবে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (আরবিআই) নিয়ম ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সব ধরনের ঋণের দায় মৃতের পরিবারের ওপর বর্তায় না। ঋণের ধরন এবং উত্তরাধিকার সূত্রের ওপর নির্ভর করে এই দায়ের হিসেব-নিকেশ সম্পূর্ণ আলাদা হয়।
লোনের ধরন অনুযায়ী আইনি দায়বদ্ধতা
ঋণ মূলত দুই প্রকারের হয়, একটি ‘সিকিওর্ড’ বা জামানতযুক্ত এবং অন্যটি ‘আনসিকিওর্ড’ বা জামানতহীন। গৃহঋণ (হোম লোন) কিংবা গাড়ি ক্রয়ের ঋণ (কার লোন) সাধারণত সিকিওর্ড লোনের অন্তর্ভুক্ত। এই ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে বাড়ি বা গাড়ি ব্যাংকের কাছে বন্ধক হিসেবে থাকে। ঋণগ্রহীতার মৃত্যুর পর যদি তার পরিবার সেই ঋণের কিস্তি বা ইএমআই পরিশোধ করতে না পারে, তবে ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী সেই সম্পত্তি নিলাম করার অধিকার রাখে। তবে নিলামের পর যদি ঋণের পুরো টাকা উসুল না হয়, এবং মৃত ব্যক্তির নামে অন্য কোনো সম্পত্তি না থাকে, তবে বাকি টাকা মওকুফ হয়ে যায়। পরিবারকে নিজের পকেট থেকে সেই টাকা দিতে হয় না। এছাড়া লোন নেওয়ার সময়ে যদি ‘লোন প্রোটেক্টর ইনস্যুরেন্স’ করা থাকে, তবে মৃত্যুর পর বীমা সংস্থাই পুরো ঋণ মিটিয়ে দেয়।
অন্য দিকে পার্সোনাল লোন কিংবা ক্রেডিট কার্ডের বিল সম্পূর্ণ জামানতহীন বা আনসিকিওর্ড লোন। এই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংক সরাসরি মৃতের ছেলে-মেয়ে বা পরিবারের কাছে টাকা দাবি করতে পারে না। ব্যাংক কেবল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া নিজস্ব সম্পত্তি, যেমন ব্যাংক ব্যালেন্স, ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি), শেয়ার বা জমিজমা থেকে সেই টাকা আদায় করার সুযোগ পায়। যদি মৃত ব্যক্তির নামে কোনো সম্পত্তি না থাকে, তবে ব্যাংক এই ঋণটি পুরোপুরি রাইট অফ বা মওকুফ করতে বাধ্য হয়।
জয়েন্ট লোন ও গ্যারান্টারের আইনি ফাঁদ
ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় জটিলতা তৈরি হয় জয়েন্ট লোন এবং গ্যারান্টার হওয়ার ক্ষেত্রে। স্বামী ও স্ত্রী যদি যৌথভাবে কোনো হোম লোন নিয়ে থাকেন, তবে একজনের মৃত্যু হলেও ঋণের সম্পূর্ণ দায় অপরজনের কাঁধে চলে আসে। একইভাবে কেউ যদি অন্য কোনো ব্যক্তির ঋণের গ্যারান্টার হন এবং মূল ঋণগ্রহীতা মারা যান, তবে ব্যাংক আইনিভাবে সেই গ্যারান্টারের কাছ থেকেই টাকা আদায় করবে। কারণ গ্যারান্টার হওয়া মানে ঋণের সমান অংশীদার হওয়া। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া এডুকেশন লোনের ক্ষেত্রে ছাত্র বা ছাত্রীর মৃত্যু হলে মানবিকতার খাতিরে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই) বা পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের (পিএনবি) মতো বড় বড় সরকারি ব্যাংক লোন মওকুফ করে দেয়। কিন্তু যদি বাবা বা মা সেখানে কো-অ্যাপ্লিকেন্ট হিসেবে যুক্ত থাকেন, তবে তাদেরই সেই ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিতে হয়।
রিজার্ভ ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও করণীয়
আরবিআই-এর প্রধান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো উত্তরাধিকারী যদি মৃতের সম্পত্তি গ্রহণ করেন, তবেই তিনি ঋণের জন্য দায়ী থাকবেন। সম্পত্তির মূল্য যতটুকু, দায়ের পরিমাণও সর্বোচ্চ ততটুকুই হতে পারে, নিজের পকেট থেকে বাড়তি কোনো টাকা দেওয়ার নিয়ম নেই। যদি বকেয়া ঋণের পরিমাণ সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়, তবে আইনিভাবে সেই সম্পত্তি ত্যাগ করার অধিকার পরিবারের রয়েছে।
ঋণ আদায়ের নামে ব্যাংক বা তাদের রিকভারি এজেন্টরা পরিবারকে কোনো প্রকার মানসিক হয়রানি বা বেআইনি চাপ দিতে পারে না। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে গ্রাহক সরাসরি পুলিশের দ্বারস্থ হতে পারেন কিংবা আরবিআই-এর নির্দিষ্ট পোর্টালে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। যেকোনো ঋণের ক্ষেত্রে তাই টার্ম ইনস্যুরেন্স থাকা অত্যন্ত জরুরি। ঋণগ্রহীতার মৃত্যুর পর পরিবারের করণীয় হলো দ্রুত ডেথ সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে সব সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে লিখিতভাবে জানানো এবং একজন আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আইনত সম্মতি এবং সই ছাড়া মৃতের কোনো ঋণের দায় পরিবারের ওপর চাপানো আসাম্ভব।