তৃণমূলের বহিষ্কারের চিঠি অবৈধ, ঋতব্রতকে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়ে স্পিকারের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত

পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নাটকীয় এবং নজিরবিহীন মোচড় তৈরি হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্য বিধানসভার নতুন বিরোধী দলনেতা (এলওপি) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন স্পিকার রথীন্দ্র বসু। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের জারি করা বহিষ্কারের ফরমানকে আইনিভাবে অবৈধ ঘোষণা করে স্পিকারের এই সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে এক চরম রাজনৈতিক সুনামি ডেকে এনেছে।
নেপথ্যে জাল সই-কাণ্ড ও সিআইডি তদন্ত
এই নজিরবিহীন সংঘাতের সূত্রপাত মূলত ‘ফোর্জারি-গেট’ বা জাল সই-কাণ্ডকে কেন্দ্র করে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অপর এক বিধায়ক সন্দীপন সাহা অভিযোগ তোলেন যে, সরকারি ও দলীয় নথিতে তাঁদের সই জালিয়াতি করে ব্যবহার করা হয়েছে। এই হুইসেলব্লোয়ারদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে রাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ একাধিক প্রভাবশালী বিধায়কের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করে। এই ঘটনার পর তড়িঘড়ি মাত্র ২০ মিনিটের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর ঋতব্রতকে দল থেকে বহিষ্কারের কড়া ফরমান জারি করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
যে কারণে বহিষ্কারের চিঠি অবৈধ
তৃণমূলের এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপকে খোদ দেশের আইন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী বলে ব্যাখ্যা করেছেন স্পিকার রথীন্দ্র বসু। স্পিকারের স্পষ্ট বক্তব্য, নিয়মের তোয়াক্কা না করে ঝড়ের গতিতে এই বহিষ্কার করা হয়েছে। দলের নিজস্ব সংবিধান অনুযায়ী, প্রথমে অভিযুক্ত সদস্যকে শোকজ করতে হয় এবং তাঁকে নিজের বক্তব্য পেশ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হয়, যা তৃণমূল নেতৃত্ব করেনি। ফলে এই চিঠি আইনিভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ।
স্পিকার তাঁর সিদ্ধান্তের সপক্ষে আরও তিনটি সুনির্দিষ্ট যুক্তি তুলে ধরেছেন। প্রথমত, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে দলত্যাগ বিরোধী আইন বাঁচানোর মতো পর্যাপ্ত বিধায়ক সংখ্যা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলনেতা বদলের জন্য তৃণমূলের পাঠানো চিঠিতে মারাত্মক আইনি ও প্রযুক্তিগত ভুল ছিল। তৃতীয়ত, শাসকদলের পাঠানো একাধিক চিঠিতে বিধায়কদের সই নিয়ে বড়সড় গরমিল রয়েছে, যা ইতিমধ্যেই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডি-র হাতে রয়েছে।
সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব
স্পিকারের এই কড়া অবস্থানের পর তৃণমূলের নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কার্যত গুরুত্ব হারিয়েছে এবং বিধানসভায় বিক্ষুব্ধ শিবির অনেকটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ‘আসল তৃণমূল’-এর নেতা হিসেবে দাবি করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিধায়কের সমর্থনে বিরোধী দলনেতার পদটি ছিনিয়ে নিতে সফল হয়েছেন। এই ঘটনার ফলে আগামী দিনে রাজ্য বিধানসভার অন্দরে শাসক দলের রাশ আলগা হওয়ার এবং রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার এক তীব্র সম্ভাবনা তৈরি হলো।