নিরাপত্তা শঙ্কায় বড় সিদ্ধান্ত, বেসরকারি সংস্থার হাত থেকে খাতা পুনর্মূল্যায়নের দায়িত্ব কেড়ে নিল সিবিএসই

ডিজিটাল পদ্ধতিতে খাতা দেখার সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নের মুখে পড়ে দ্বাদশ শ্রেণীর খাতা পুনর্মূল্যায়ন (রি-ইভ্যালুয়েশন) প্রক্রিয়ায় এক ঐতিহাসিক বদল আনল সিবিএসই বোর্ড। হায়দরাবাদের বেসরকারি সংস্থা ‘কোয়েম্প এডুটেক প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তৈরি অন-স্ক্রিন মার্কিং (ওএসএম) সিস্টেমের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খাতা দেখার পুরো প্রক্রিয়াটি এখন থেকে বোর্ডের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকা পোর্টালে সম্পন্ন হবে। আগামী সপ্তাহ থেকেই এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের কাজ শুরু হতে চলেছে এবং তার আগেই পরীক্ষার্থীদের সমস্ত গোপনীয় ডেটা বোর্ডের নিজস্ব পরিকাঠামোয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ও আইআইটি বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপ
চলতি বছরে দ্বাদশ শ্রেণীর প্রায় এক কোটি খাতা ডিজিটাল পদ্ধতিতে মূল্যায়নের জন্য দেশজুড়ে প্রথমবার এই ওএসএম সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। কিন্তু গত ১৩ মে পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই এই পদ্ধতিকে ঘিরে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। বহু ছাত্রছাত্রী অভিযোগ তোলেন যে, স্ক্রিনশটে খাতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, নম্বর দেওয়ায় অসঙ্গতি রয়েছে এবং ওয়েবসাইট ঠিকমতো কাজ করছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক আইআইটি কানপুর এবং আইআইটি মাদ্রাজের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে চার সদস্যের একটি দল গঠন করে। এই উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ মেনেই পরীক্ষার্থীদের তথ্যের নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো ব্যবস্থাটি বোর্ডের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বোর্ড সরাসরি নিরাপত্তা ত্রুটির কথা স্বীকার না করলেও জানিয়েছে, মূল্যায়নের গোপনীয়তা ও নির্ভুলতা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ।
নকল শংসাপত্র ও দরপত্রের অস্বচ্ছতা
তদন্তে উঠে এসেছে যে, টেন্ডার বা দরপত্র পাওয়ার জন্য কোয়েম্প সংস্থাটি যে সমস্ত সাইবার সিকিউরিটি প্রশংসাপত্র জমা দিয়েছিল, তার মধ্যে ওড়িশার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা দেখার পুরনো সার্টিফিকেট ছিল, যার মেয়াদ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্য একটি সার্টিফিকেটও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অ্যাপের পরীক্ষার। অথচ গত ফেব্রুয়ারি মাসেই নিসর্গ অধিকারী নামের এক ১৯ বছরের ছাত্র এবং তীর্থ পারমার নামের এক সাইবার গবেষক এই সিস্টেমে বড় ধরনের গলদ খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁদের দাবি ছিল, এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে যে কেউ পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত তথ্য ও খাতা দেখার ডেটাবেসে ঢুকে পড়তে পারত। ইতিমধ্যেই সিবিএসই এই পোর্টালে সাইবার হানার অভিযোগ তুলে দিল্লি পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করেছে। ছাত্র সংগঠন ও সমাজকর্মীদের অভিযোগ, গত বছর আগস্ট মাসে যখন এই কাজের জন্য দরপত্র ডাকা হয়, তখন নিয়মকানুন অনেকটাই শিথিল করা হয়েছিল, যা প্রকারান্তরে ওই নির্দিষ্ট সংস্থাকেই সুবিধা পাইয়ে দেয়।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও বর্তমান স্থিতি
এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনে সিবিএসই-র মতো বড় বোর্ডের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে। আউটসোর্সিং বা বেসরকারি সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা এই ঘটনা প্রমাণ করেছে। তবে বোর্ডের পক্ষ থেকে কড়া অবস্থান নিয়ে জানানো হয়েছে, খাতা পুনর্মূল্যায়ন সহ পরীক্ষার সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই সংস্থাকে কোনও অর্থ দেওয়া হবে না। আগামী ৭ জুন পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের খাতার স্ক্রিনশট দেখে আপত্তি জানানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি পড়ুয়া খাতা যাচাই ও পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন জানিয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার খাতা এখন বোর্ডের নতুন নিরাপদ ব্যবস্থার মাধ্যমেই খতিয়ে দেখা হবে, যা পড়ুয়া ও অভিভাবকদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়েছে।