নিজের সন্তান জন্ম দেবে কৃত্রিম মেধা, ভস্মাসুর তৈরির আশঙ্কায় ঘুম উড়েছে স্বয়ং নির্মাতাদেরই!

নিজের সন্তান জন্ম দেবে কৃত্রিম মেধা, ভস্মাসুর তৈরির আশঙ্কায় ঘুম উড়েছে স্বয়ং নির্মাতাদেরই!

কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি এবার খোদ এর নির্মাতাদের বুকেই কাঁপন ধরাচ্ছে। মার্কিন প্রথম সারির এআই সংস্থা অ্যানথ্রপিক তাদের সাম্প্রতিক এক গবেষণামূলক ব্লগে জানিয়েছে, তাদের তৈরি জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘ক্লড এআই’ এখন মানুষের সাহায্য ছাড়াই নিজের উত্তরসূরি বা নতুন এআই মডেলের নকশা, নির্মাণ ও প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম। কৃত্রিম মেধার এমন ‘পুনরাবৃত্তিমূলক আত্ম-উন্নয়ন’ (ইটারেটিভ সেলফ-ইম্প্রুভমেন্ট) প্রযুক্তিবিশ্বে যেমন শোরগোল ফেলেছে, তেমনই তৈরি করেছে এক চরম অনিশ্চয়তা। খোদ অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদি এই প্রযুক্তির লাগামছাড়া অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন।

অভাবনীয় গতি ও মানুষের বিকল্প হওয়ার উপক্রম

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এআই প্রযুক্তির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বর্তমানে প্রতি চার মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে, যা আগে ছিল সাত মাস। ২০২৪ সালে যেখানে ‘ক্লড ওপাস ৩’ একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের প্রায় সব কাজ মাত্র চার মিনিটে করে ফেলত, সেখানে বর্তমানের ‘ক্লড ওপাস ৪.৬’ মানুষের ১২ ঘণ্টার কাজ নিমেষে সম্পন্ন করছে। শুধু তাই নয়, এআই মডেল তৈরির বেশির ভাগ কোড এখন ‘ক্লড’ নিজেই লিখছে, যার ফলে ২০২৪ সালের তুলনায় তাদের দৈনিক কোড তৈরির পরিমাণ প্রায় আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রযুক্তিটির এই বিবর্তন প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিলে দেখা যায়, শুরুর দিকে ইঞ্জিনিয়ারেরা হাতে-কলমে কোড লিখতেন। এরপর আসে চ্যাটবট, যা ছোটখাটো কোড তৈরিতে সাহায্য করত। বর্তমানে তা রূপান্তরিত হয়েছে স্বাধীন ‘কোডিং এজেন্টে’, যারা নিজেরাই ফাইল লিখতে, সম্পাদনা করতে এবং অন্য এজেন্টদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিতে পারে। ফলে মানুষের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। কোডিং ও গবেষণামূলক কাজে দক্ষতার কারণে চলতি বছরে কঠিন কোডিংয়ে ক্লডের সাফল্যের হার ৭৬ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে।

ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের দাবি

প্রযুক্তির এই অনিয়ন্ত্রিত উল্লম্ফন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র কর্মহীনতার আতঙ্ক তৈরি করেছে। রয়টার্সের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ আমেরিকাবাসী আশঙ্কা করছেন যে এআই-এর উত্থানের কারণে তাঁদের পরিবারের কেউ না কেউ চাকরি হারাবেন। বয়স, লিঙ্গ বা শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে এই ভয় সমাজকে গ্রাস করছে।

এই পরিস্থিতিতে অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও দারিও আমোদি সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তি একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই সামাজিক বিপর্যয় রুখতে তিনি বিশ্বব্যাপী সমস্ত এআই সংস্থাকে একত্রিত হয়ে গবেষণার গতি শ্লথ করার এবং একটি পারস্পরিক বোঝাপড়ায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজনে সরকারের হস্তক্ষেপ ও কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এআই টুল নিষিদ্ধ করার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি।

ইতিমধ্যেই অ্যানথ্রপিক তাদের সাইবার নিরাপত্তার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতে ‘মিথোস’ মডেলে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা বা ‘গার্ডরেল’ যুক্ত করেছে। অন্যদিকে, বাজারে নিয়ে আসা হয়েছে তাদের এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল ‘ক্লড ফেবল ৫’। বর্তমানে প্রায় ৯৬,৫০০ কোটি ডলার বাজারমূল্যের এই মার্কিন টেক জায়ান্টটি তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই-এর সাথে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির লড়াইয়ে নামলেও, খোদ নিজেদের তৈরি এআই ব্যবস্থার অভাবনীয় ক্ষমতাই এখন মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *