রায়গঞ্জ নয় এবার শিলিগুড়িতেই এইমস, উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কি বড়সড় বদল আসতে চলেছে!

উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও জমিজট কাটিয়ে অবশেষে শিলিগুড়িতেই গড়ে উঠতে চলেছে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস বা এইমস-এর নতুন শাখা। অতীতে রায়গঞ্জে এই আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও, বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতায় শিলিগুড়ি লাগোয়া ফাঁসিদেওয়া এবং মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি এলাকাকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় এই এলাকাগুলোতে উপযুক্ত সরকারি জমি চিহ্নিতকরণের সমীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, একটি পূর্ণাঙ্গ এইমস ক্যাম্পাস গড়ে তোলার জন্য সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ একর জমির প্রয়োজন হয়। যেখানে ন্যূনতম ৭৫০ থেকে ১০০০ শয্যার সর্বাধুনিক হাসপাতালসহ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন এবং আধুনিক গবেষণাগার নির্মাণ করা সম্ভব। বর্তমানে শিলিগুড়ির ফাঁসিদেওয়া এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সুলভ সরকারি জমির প্রাচুর্যের কারণে এই অঞ্চলটি দৌড়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বাগডোগরা বিমানবন্দর, জাতীয় সড়ক এবং উন্নত রেল যোগাযোগের সুবিধা থাকায় ফাঁসিদেওয়াকে অত্যন্ত সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জমি চিহ্নিতকরণ ও প্রশাসনিক তৎপরতা রাজ্যের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন যে, উত্তরবঙ্গে এইমস নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে তিনটি জায়গা পরিদর্শন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ফাঁসিদেওয়ার জালাস নিজামতারা পঞ্চায়েতের আমবাগান এলাকার প্রায় ৬৩ একর জমি এবং পার্শ্ববর্তী মনি চা বাগান সংলগ্ন সরকারি লিজের জমি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। অন্যদিকে, মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি এলাকাতেও উপযুক্ত জমি খোঁজার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। জমিগুলোর আইনি জটিলতা বা চরিত্রগত কোনো সমস্যা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর কাজ শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উত্তরবঙ্গে এইমস গড়ার বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং নির্বাচনী সংকল্পপত্রের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উন্নয়নের কারণ ও সম্ভাব্য বহুমুখী প্রভাব বিগত ২০০৮ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সির উদ্যোগে রায়গঞ্জের জলশালায় এইমস তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক অনীহা ও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় তা ভেস্তে যায় এবং প্রকল্পটি কল্যাণীতে স্থানান্তরিত হয়। তবে এবার রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সমন্বিত প্রয়াসে এই উদ্যোগ পুনরায় গতি পেয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শিলিগুড়িতে এইমস প্রতিষ্ঠিত হলে তার ইতিবাচক প্রভাব কেবল উত্তরবঙ্গের আটটি জেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিহার, আসাম, সিকিমসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ উন্নত ও সাশ্রয়ী বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পাবেন। এর ফলে একদিকে যেমন কলকাতার ওপর চিকিৎসার অতিরিক্ত চাপ কমবে, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে চিকিৎসা পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।