আলো ঝলমলে টলিপাড়ার অন্তরালে গভীর সংকট, আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে নবান্নে নজিরবিহীন বৈঠক!

আলো ঝলমলে টলিপাড়ার অন্তরালে গভীর সংকট, আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে নবান্নে নজিরবিহীন বৈঠক!

বাংলা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের আলো ঝলমলে জগতের আড়ালে থাকা একাধিক দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল সমস্যা সমাধানে এবার বড়সড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। বাইরে থেকে টলিউডকে যতটা রঙিন মনে হয়, ভেতরে টালমাটাল সাংগঠনিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা শিল্পের ভবিষ্যৎকে ততটাই উদ্বেগে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি নবান্নের কনফারেন্স হলে রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে টলিপাড়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়, রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ ও পাপিয়া অধিকারী। সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. সুব্রত গুপ্ত, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রধান সচিব শান্তনু বসু, চলচ্চিত্র অধিকর্তা কৃত্তিবাস নায়ক এবং মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের অতিরিক্ত সচিব শান্তনু বসু।

কাঠামোগত সংস্কার ও জীবিকার সংকট

উক্ত বৈঠকের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান সাংগঠনিক অস্থিরতা। ফেডারেশন এবং বিভিন্ন গিল্ডের ভূমিকা ও কার্যপ্রণালী নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রতিনিধিরা জানান, ফেডারেশনকে যদি দ্রুত আরও পেশাদার এবং স্বচ্ছ পদ্ধতিতে পরিচালিত না করা যায়, তবে গোটা শিল্পই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হবে। যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে হাজার হাজার টেকনিশিয়ান ও দিনমজুর কর্মীর জীবিকার ওপর। বর্তমানে ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও নতুন কমিটি গঠিত না হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে যেহেতু ফেডারেশন ও গিল্ডগুলি ট্রেড ইউনিয়ন আইন, ১৯২৬ অনুযায়ী নিবন্ধিত, তাই যেকোনো ধরনের পরিবর্তন আইনি ও সরকারি বিধি মেনেই করা হবে। আপাতত বর্তমান কাঠামো বহাল রেখে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য আইনি পথ খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সমাধানের খোঁজে উপদেষ্টা কমিটি ও প্রশাসনিক তৎপরতা

টলিউডের কাজকর্ম স্বাভাবিক রাখতে এবং সংকট কাটাতে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই কমিটির সম্ভাব্য তালিকায় রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, দীপক অধিকারী, জিশু সেনগুপ্ত, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রথম সারির শিল্পী ও পরিচালকদের পাশাপাশি সরকারি উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নাম রয়েছে। এছাড়া, ফেডারেশন ও গিল্ডগুলির বর্তমান আইনি অবস্থান জানতে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট সংগ্রহ করবে, যা পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনে থাকা প্রায় চল্লিশটি কমিটির কাজের ক্ষেত্র পর্যালোচনা করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ও সমগোত্রীয় সংস্থাগুলি একীভূত করার সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। সরকারি হল ও অডিটোরিয়াম বণ্টনে স্বচ্ছতা আনতে অভিন্ন আবেদনপত্র চালু এবং বার্ষিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ক্যালেন্ডার নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সংস্কার সফল হলে বাংলা বিনোদন শিল্প কেবল তারকাদের কেন্দ্র করে নয়, বরং এর পেছনে থাকা হাজার হাজার সাধারণ কর্মীর জন্য একটি সুসংগঠিত, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল কর্মক্ষেত্রে পরিণত হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *