সোরাবর্দি অ্যাভিনিউ এখন গোপাল মুখার্জি রোড, অতীত বিতর্ক টেনেই গর্বিত পর্দার ‘গোপাল পাঁঠা’ সৌরভ দাস

কলকাতার বুকে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সাক্ষী থাকল বাংলার রাজনীতি ও সংস্কৃতি মহল। পার্ক সার্কাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সোরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো ‘গোপাল মুখার্জি রোড’। পশ্চিমবঙ্গ দিবসে কলকাতা পুরসভার নেওয়া এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে রবিবার এক্স হ্যান্ডেলে স্বাগত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের এই পদক্ষেপে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন রূপোলি পর্দায় গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয় করা টলিউড অভিনেতা সৌরভ দাস। তবে এই আনন্দের আবহেই অভিনেতা মনে করিয়ে দিয়েছেন বিগত বছরের ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ ছবিটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।
বিতর্ক থেকে স্বীকৃতি এবং অভিনেতার গর্ব
বিবেক অগ্নিহোত্রী পরিচালিত ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ সিনেমায় বিতর্কিত চরিত্র ‘গোপাল পাঁঠা’ ওরফে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল সৌরভ দাসকে। ছবিটির ট্রেলার মুক্তির পরেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল এই বাঙালি অভিনেতাকে। এমনকী খোদ গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের পরিবারের পক্ষ থেকেও ছবিটি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ‘বাংলা বিরোধী সিনেমা’য় অভিনয় করার জন্য সেসময় নানামুখী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল সৌরভকে।
রাজ্য সরকারের নতুন এই সিদ্ধান্তের পর সেই অতীত বিতর্ক টেনেই অভিনেতা জানান, একসময় যে ব্যক্তিত্বের নাম মুখে আনাও বারণ ছিল, আজ তাঁর নামে কলকাতার প্রধান রাস্তার নামকরণ হওয়ার এই সফরটি দারুণ সুন্দর। তাঁর মতে, চরিত্রটিকে দীর্ঘকাল অন্তরালে রাখা হয়েছিল বলেই সাধারণ মানুষ ওঁর প্রকৃত অবদান সম্পর্কে জানতেন না। নিজের অভিনয়ের সূত্র ধরে তো বটেই, একজন বাঙালি হিসেবেও এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে তিনি গভীরভাবে অভিভূত ও গর্বিত।
নাম পরিবর্তনের নেপথ্য কারণ ও রাজনৈতিক প্রভাব
১৯৪৬ সালের মহম্মদ আলি জিন্নার ‘ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর রক্তাক্ত অধ্যায়ে হিন্দু বাঙালিদের রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন বউবাজারের বাসিন্দা পেশায় কসাই গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এতদিন পার্ক সার্কাসের এই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য স্যার হাসান সোরাবর্দির নামে উৎসর্গীকৃত থাকলেও, বর্তমান শুভেন্দু সরকার একে এক ‘ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন’ হিসেবে দেখছে। পশ্চিমবঙ্গ দিবসে তারকেশ্বরের এক সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও অতীতে সরকারি মদতে এই সমস্ত ইতিহাস চেপে রাখার অভিযোগ তুলে বিগত সরকারগুলিকে আক্রমণ করেন।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নাম বদলের সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ ও ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত ঐতিহাসিক চরিত্রদের জনমানসে ফিরিয়ে আনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এই ঘটনা তারই একটি বড় প্রতিফলন।