‘একটি ঘড়ি পাঠাব!’— এক মেসেজেই ফাঁস NEET-UG কাণ্ড, CBI চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি রহস্য

‘একটি ঘড়ি পাঠাব!’— এক মেসেজেই ফাঁস NEET-UG কাণ্ড, CBI চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি রহস্য

‘স্যর, আপনার ঠিকানাটা একটু দেবেন? একটা ঘড়ি পাঠাব’— এক ছাত্রের অভিভাবকের পাঠানো এই সামান্য উপহারের মেসেজই কাল হলো এনটিএ-র (NTA) সাবজেক্ট এক্সপার্ট পিভি কুলকার্নির জন্য। বাইরে থেকে মেসেজটি দেখতে অত্যন্ত সাধারণ মনে হলেও, এটি ধরেই চিকিৎসাবিদ্যার প্রবেশিকা পরীক্ষা NEET-UG প্রশ্নফাঁসের এক বিরাট চক্রের সন্ধান পেল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (CBI)।

শুক্রবার নিট প্রশ্নফাঁস মামলায় আদালত ও তদন্তকারীদের হাতে ৯৪ পাতার একটি দীর্ঘ চার্জশিট তুলে দিয়েছে সিবিআই। এতে মোট ১৩ জন অভিযুক্তের নাম রাখা হয়েছে। ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (NTA) ভেতরের কয়েকজন আধিকারিক ও অধ্যাপক কীভাবে সুপরিকল্পিতভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস করতেন এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেন চালাতেন, তার নিখুঁত বিবরণ রয়েছে এই চার্জশিটে।

তদন্তের সূত্রপাত যেভাবে:

রসায়নের প্রশ্নপ্রণেতা পিভি কুলকার্নির কাছে আসা ঘড়ি উপহার দেওয়ার মেসেজ থেকেই সন্দেহ শুরু হয় সিবিআইয়ের। এরপরই কুলকার্নির আবাসন ‘মাইগেট’ (MyGate) অ্যাপের লগ বুক পরীক্ষা করেন তদন্তকারীরা। সেখানে দেখা যায়, একের পর এক পরীক্ষার্থী ও অভিভাবক কুলকার্নির ফ্ল্যাটে যাতায়াত করেছেন। পাশাপাশি ‘Fifa world cup’ নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের চ্যাট বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকজন পড়ুয়ার হদিশ মেলে, যাঁরা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে প্রশ্নপত্র কিনেছিলেন।

হোটেল রুমে প্রশ্ন মুখস্থ ও বিশেষ ক্লাস ফাঁদ:

চার্জশিটের বিস্ফোরক দাবি অনুযায়ী, এনটিএ-র প্যানেলে থাকা রসায়নের শিক্ষক কুলকার্নি এবং তাঁর সহযোগীরা প্রশ্ন করার সময়েই তা মুখস্থ করে রাখতেন। পরে গোপন হোটেলে গিয়ে কাগজে তা লিখে অন্যদের হাতে তুলে দিতেন।

এমনকি কুলকার্নির মোবাইল ফোন থেকে পরীক্ষার আগেই ফাঁস হওয়া রসায়ন প্রশ্নপত্রের ৯টি ছবি এবং সমাধানকৃত উত্তরপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক ‘Special Class’-এর নামে একটি বিশেষ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছিলেন। অভিযোগ, বিশেষ ক্লাসের নামে অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা টাকা নেওয়া হতো এবং বিনিময়ে পড়ুয়াদের হাতে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দেওয়া হতো। কুলকার্নি ও তাঁর সহযোগী মনীষা ওয়াঘমার মিলে এই টাকা তুলতেন।

পদার্থবিদ্যার প্রশ্নও মাত্র ২৫ হাজারে ফাঁস!

শুধু রসায়ন নয়, পদার্থবিদ্যার প্রশ্নপত্র ফাঁসে নাম জড়িয়েছে এনটিএ-র প্যানেলে থাকা অন্য এক শিক্ষিকা মনীষা হাওলদারের। ইংরেজি থেকে মারাঠি ও মারাঠি থেকে ইংরেজিতে প্রশ্ন অনুবাদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অভিযোগ, মাত্র ২৫,০০০ টাকার বিনিময়ে তিনি পদার্থবিদ্যার প্রশ্নপত্র পাচার করেন।

একাধিক রাজ্যে বিস্তৃত এই জালিয়াতি চক্র:

সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে, এই প্রশ্নফাঁস চক্রটি শুধু একটি রাজ্যে সীমিত ছিল না। পরীক্ষার চার দিন আগেই ১১ সেট ফাঁস হওয়া প্রশ্ন একটি কালো হুন্ডাই ভার্না (Hyundai Verna) গাড়িতে করে রাজস্থানের ঝুনঝুনুতে পাঠানো হয়েছিল। রাজস্থানের সিকারের বাসিন্দা মঙ্গলীলাল বিভাল ও দীনেশ বিভাল নামে দুই অভিযুক্তের কাছ থেকে ভৌতবিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিদ্যার ছাপানো প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেছেন সিবিআই আধিকারিকেরা।

উল্লেখ্য, জালিয়াতির জেরে গত ৩ মে-র পরীক্ষা বাতিল করে এনটিএ এবং ২১ জুন পুনরায় নতুন পরীক্ষা নেওয়া হয়। সিবিআই চার্জশিট পেশ করার পর এখন এই জালিয়াতি চক্রে জড়িত অন্যান্য রাঘববোয়ালদের খোঁজ মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *