“আমাদের লালবাগ আমাদেরই থাক!” পার্কের জমিতে সরকারি নির্মাণ বিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল বেঙ্গালুরু

“আমাদের লালবাগ আমাদেরই থাক!” পার্কের জমিতে সরকারি নির্মাণ বিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল বেঙ্গালুরু

‘হাসিরে উসিরু, লালবাগ উলিসি’ (সবুজ বাঁচাও, লালবাগ বাঁচাও)— কন্নড় ভাষার এই বার্তা লেখা বড় বড় ব্যানার হাতে রবিবার সকালে লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেনে জমায়েত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। কারও হাতে লেখা ‘আমাদের লালবাগ, আমাদেরই থাক!’, আবার কেউ আক্ষেপের সুরে লিখেছেন ‘বিদায় লালবাগ!’ পার্কের জমিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিতে বেঙ্গালুরু আজ নজিরবিহীন নাগরিক প্রতিবাদের সাক্ষী।

১৭৬০ সালে মহীশূরের শাসক হায়দার আলি এই ঐতিহাসিক ২৪০ একরের লালবাগ উদ্যানের কাজ শুরু করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর পুত্র টিপু সুলতান তা সম্পূর্ণ করেন। এই প্রাচীন উদ্যানের বিখ্যাত কাঁচের ঘর (গ্লাস হাউস), শান্ত হ্রদ এবং শতবর্ষী বৃক্ষমালা প্রতিদিন হাজার হাজার শহরবাসী ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কিন্তু সম্প্রতি কর্নাটক বিধানসভায় পাস হওয়া একটি নতুন আইন এই ঐতিহ্যবাহী উদ্যানসহ রাজ্যের সমস্ত পার্কের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আইন ঘিরে বিতর্ক:

গত ২৪ আগস্ট কর্নাটক সরকার ‘দ্য কর্নাটক গভর্নমেন্ট পার্কস (প্রিজারভেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ পাস করেছে। এই আইনের মাধ্যমে সরকার জনস্বার্থ বা পরিকাঠামো উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যে কোনো সরকারি পার্কের ৫ শতাংশ জমি সরকারি দফতর, পুরসভা বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে হস্তান্তর, লিজ বা বিক্রি করতে পারবে। অভিযোগ উঠেছে, বেঙ্গালুরুর বহুল বিতর্কিত ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল রোড প্রকল্পের পথ সুগম করতেই তড়িঘড়ি বিধানসভায় এই সংশোধনী আনা হয়েছে।

এক দিনের নোটিসে জনসমুদ্র:

আইনটি পাস হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন পরিবেশবিদ ও সাধারণ মানুষ। মাত্র এক দিনের নোটিসে ডাকা এই প্রতিবাদে শামিল হন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মীদের পাশাপাশি অটোচালক, সবজি বিক্রেতা, ছোট ব্যবসায়ী এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

প্রতিবাদকারীদের বক্তব্য, যাতায়াতের জন্য অতিরিক্ত গাড়ি ও ধুলোবালি ইতোমধ্যেই বেঙ্গালুরুকে একপ্রকার বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। শহরের সবুজ এলাকা অন্তত দশ গুণ বাড়ানো যেখানে জরুরি, সেখানে উল্টে পার্কের জমি দখলের চক্রান্ত চলছে। লালবাগের পাশাপাশি শহরের ২২ কিলোমিটার দূরে প্রস্তাবিত নতুন উপনগরী তৈরির উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপুল পরিমাণ গাছ কাটা পড়বে ও কৃষিজমি নষ্ট হবে, যা বেঙ্গালুরুর দূষণ ও তীব্র জলসংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

কয়েক বছর আগের জলজট, স্পিডবোট চেপে কর্পোরেট কর্তাদের অফিসে যাওয়া কিংবা চড়া দামে পানীয় জল কেনার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাগরিকরা জানান— এককালের ‘গার্ডেন সিটি’ বা বাগান শহর আজ মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে এই বিল প্রত্যাহার না করা হলে রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নাগরিক সমাজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *