১২৫ বছরের রেকর্ড ভাঙল অগস্ট: তীব্র গরমে পুড়ল দেশ, বর্ষার মরসুমেও বৃষ্টির বিরাট ঘাটতি

১২৫ বছরের রেকর্ড ভাঙল অগস্ট: তীব্র গরমে পুড়ল দেশ, বর্ষার মরসুমেও বৃষ্টির বিরাট ঘাটতি

এক চরম নজির গড়ে ফেলল ২০২৬ সালের অগস্ট মাস। ১৯০১ সালে ভারতে সরকারিভাবে আবহাওয়া সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য নথিভুক্ত করা শুরু হওয়ার পর থেকে বিগত ১২৫ বছরের ইতিহাসে এই বছর অগস্টকে দেশের উষ্ণতম মাস হিসেবে চিহ্নিত করল কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)। মৌসম ভবনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অগস্টে দেশজুড়ে গড় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৮.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিক দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় প্রায় ০.৬৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

শুধু দিনের তাপমাত্রাই নয়, গত সোয়া এক শতাব্দীর মধ্যে এই অগস্টেই রাতের গড় তাপমাত্রাও সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। মূলত দুর্বল হয়ে পড়া মৌসুমি বায়ু এবং প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র প্রভাবেই এমন বৈরী আবহাওয়া তৈরি হয়েছে বলে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন।

আইএমডি-র ডিরেক্টর জেনারেল মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, অগস্টে দেশজুড়ে বৃষ্টির বিরাট ঘাটতিই এই নজিরবিহীন উষ্ণতা বৃদ্ধির মূল কারণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ মাসে গোটা দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ১৬.৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। দেশের ৭৪১টি প্রশাসনিক জেলার মধ্যে ৩৪৮টি জেলাতেই—অর্থাৎ ৪৭ শতাংশেরও বেশি অংশে চরম বৃষ্টির ঘাটতি দেখা গেছে। চলতি বছরের জুনে যেখানে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল ৩৫ শতাংশ, সেখানে জুলাইয়ে পরিস্থিতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। তবে অগস্টের এই বিশাল ঘাটতির কারণে গোটা বর্ষা মরশুমেই সামগ্রিক বৃষ্টির ঘাটতি বেড়ে দাঁড়াল প্রায় ১৪ শতাংশে। মূলত প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো তৈরি হওয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যায় এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের ওপর বায়ুচাপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে সারা দেশে বৃষ্টির স্বাভাবিক ধারাকে ব্যাহত করেছে।

তবে গোটা দেশের অধিকাংশ অঞ্চল যখন খরা ও তীব্র গরমে বৃষ্টির অপেক্ষা করছিল, তখন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে ওডিশা ও দক্ষিণবঙ্গে। হাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, অগস্টে বঙ্গোপসাগরে মোট ৬টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়ে টানা ২৬ দিন সক্রিয় ছিল, যেখানে সাধারণ সময়ে অগস্টে নিম্নচাপের স্থায়ীত্ব থাকে মাত্র ১৬ দিন। এই ১০ দিন অতিরিক্ত স্থায়িত্বের কারণে ওডিশা ও দক্ষিণবঙ্গজুড়ে গোটা মাসজুড়ে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই নিম্নচাপগুলি উত্তর-পশ্চিমমুখী হলেও গুজরাত বা রাজস্থান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে, হিমালয়ে তৈরি হওয়া পশ্চিমি ঝঞ্ঝা কেবল পাহাড়ি এলাকাতেই বৃষ্টি ঝরিয়েছে, যার ফলে উত্তর ভারতের সমতল এলাকা শুকনোই থেকে গেছে। পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের পাশাপাশি কর্ণাটক, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, বিহার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে তীব্র খরা পরিস্থিতি বজায় ছিল।

আগামী দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে গিয়ে আইএমডি সতর্ক করে জানিয়েছে যে, সেপ্টেম্বরেও দেশের বহু অংশে বর্ষার আগমন ও বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কমই থাকবে। তবে উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব, পূর্ব, পূর্ব-মধ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের কয়েকটি নির্দিষ্ট পকেটে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু বেশি বৃষ্টি হতে পারে। তবে বৃষ্টি যাই হোক না কেন, দেশের সিংহভাগ এলাকাতেই দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কিছুটা উঁচুতে থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দফতর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *