শান্ত সৌন্দর্যের আড়ালে ভয়াল বিপদ! সিকিমের ১৬ হিমবাহ-হ্রদ ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’, বিপর্যয় এড়াতে জোর তৎপরতা

শান্ত সৌন্দর্যের আড়ালে ভয়াল বিপদ! সিকিমের ১৬ হিমবাহ-হ্রদ ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’, বিপর্যয় এড়াতে জোর তৎপরতা

নর্থ সিকিমের গুরুদোংমার লেকের বরফাবৃত রূপ কিংবা লাচেন-লাচুংয়ের শান্ত জলরাশি—বছরভর পর্যটকদের মুগ্ধ করে। কিন্তু এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালেই ঘনাচ্ছে এক অদৃশ্য বড় বিপদ। সাউথ লোনাক বিপর্যয়ের ক্ষত এখনো তাজা, তার মাঝেই কাশ্মীর থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ-হ্রদগুলির ওপর নজরদারি কড়া করেছে কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে সিকিমের ৪০০টিরও বেশি হিমবাহ-হ্রদের মধ্যে ১৬টিকে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ন্যাশনাল ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDMA)।

ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলির তালিকা:

চিহ্নিত ১৬টি হ্রদের মধ্যে ১৩টি উত্তর সিকিমে এবং ৩টি পশ্চিম সিকিমে অবস্থিত। বাঙালি পর্যটকদের প্রিয় গুরুদোংমার লেকগুচ্ছের তিনটি হ্রদ (গুরুদোংমার–এ, বি এবং সি) ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে সাউথ লোনাক, নর্থ লোনাক, লাচেন খাংসে, লাচুং খাংসে, শাকো ছো, টিকিপ, ভালাই পোখরি, দুধ পোখরি, চ্যাংসাং, ইউলহে খাংসে, খাংচুং ছো এবং টেনচুংকা হ্রদ। তবে স্বস্তির বিষয়, এই হ্রদগুলির কোনটির সাথেই চিনের সরাসরি জল-সংযোগ নেই; সবক’টিই ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত এবং সিকিমের নদী ব্যবস্থার সাথে যুক্ত।

শিক্ষা নেপাল ও সাউথ লোনাক থেকে:

সম্প্রতি নেপালে বিধ্বংসী হড়পা বানের পর তারা ‘গ্লফ সঞ্জীবনী’ (GLOF Sanjeevani) প্রকল্পের মাধ্যমে চারটি হিমবাহ-হ্রদের জলস্তর কমানোর কাজ শুরু করেছে। একই পথ বেছে নিয়েছে সিকিম সরকারও। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সাউথ লোনাক হ্রদ ফেটে আচমকা তিস্তা অববাহিকায় যে তণ্ডবলীলা ঘটেছিল—ব্রিজ, রাস্তা ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়েছিল—তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন কেবল হ্রদের জল নয়, চারপাশের তুষারধস, ভূমিধসের সম্ভাবনা এবং নীচের উপত্যকায় বন্যার গতিপথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রযুক্তি নির্ভর বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ:

ইতিমধ্যেই ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানো হয়েছে। ১৭ হাজার ফুট বা তার বেশি উচ্চতায় বাথিমেট্রিক (Bathymetric) প্রযুক্তি ব্যবহার করে হ্রদের গভীরতা ও জলধারণ ক্ষমতা মাপা হচ্ছে। সমীক্ষা করা বৃহত্তম হ্রদটির জলধারণ ক্ষমতা প্রায় ৭ কোটি ঘনমিটার।

ঝুঁকি কমাতে অভিনব পরিকল্পনা:

  • সৌর পাম্পে জল নিস্কাশন: ছাঙ্গু থেকে ১২ কিমি দূরের শাকো চু হ্রদের ভঙ্গুর প্রাকৃতিক বাঁধের ওপর চাপ কমাতে বাঁধ না কেটে ৮টি সৌরচালিত পাম্প বসিয়ে প্রায় ৮০ লক্ষ ঘনমিটার জল সরানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
  • কৃত্রিম বাফার ও সুরক্ষাপ্রাচীর: ডোলমা স্যাম্পাং এলাকার প্রায় ৩০০ হেক্টর সমতল ভূমিকে আরও কার্যকর বাফার হিসেবে গড়ে তুলতে পাথরের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুদোংমার হ্রদগুচ্ছে মোরেন-সুরক্ষা দেওয়াল গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
  • আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা: জলস্তর মাপতে সেন্সর, উত্তর সিকিমে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বসানো হচ্ছে ডপলার রাডারও।

হিমালয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে ধস বা বরফধসের কারণে যেকোনো মুহূর্তে পাহাড়ি নদী ভয়াল রূপ নিতে পারে। তাই সিকিম প্রশাসনের মূল লক্ষ্য এখন বিপর্যয় ঘটার পর উদ্ধারকাজ চালানো নয়, বরং বিপর্যয়ের আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা নিষ্ক্রিয় করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *