ভুলে যাওয়া কি শুধুই বার্ধক্য, নাকি লুকিয়ে মারাত্মক রোগ? চিনুন অ্যালঝাইমার্সের লক্ষণ
বয়স বাড়লে হাতের কাছে থাকা জিনিস খুঁজে না পাওয়া, পরিচিতের নাম ভুলে যাওয়া কিংবা ফ্রিজ খুলে কী নিতে এসেছিলেন তা মনে করতে না পারাটা খুবই সাধারণ ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু এই সাধারণ স্মৃতিলোপের আড়ালেই যদি বাসা বাঁধে ডিমেনশিয়া বা অ্যালঝাইমার্সের মতো মরণরোগ?
বিশ্ব অ্যালঝাইমার্স দিবসে জেনে নেওয়া জরুরি—ভুলে যাওয়া কখন বিপজ্জনক রূপ নেয়, এর আসল কারণ কী এবং আক্রান্তদের পরিবারের দৈনন্দিন লড়াইটাই বা কেমন।
ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝাইমার্স: তফাত কোথায়?
অনেকেই ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝাইমার্সকে একই রোগ বলে ভুল করেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান ডাঃ গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ডিমেনশিয়া কোনো একটি নির্দিষ্ট রোগ নয়, এটি একটি ‘আমব্রেলা টার্ম’ বা ছাতার মতো।
- ডিমেনশিয়া: এটি একটি উপসর্গ বা লক্ষণ, যেখানে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায় (যেমন—জ্বর একটি উপসর্গ)।
- অ্যালঝাইমার্স: এটি ডিমেনশিয়ার প্রধান কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই পরবর্তীতে অ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত হন।
মস্তিষ্কে কীভাবে থাবা বসায় এই রোগ?
চিকিৎসকদের মতে, অ্যালঝাইমার্স হলে মস্তিষ্কের কোষে ‘অ্যামিলয়েড’ (Amyloid) এবং ‘টাউ’ (Tau) নামক ক্ষতিকারক প্রোটিনের আস্তরণ জমা হতে থাকে। এর ফলে:
- সুস্থ স্নায়ুকোষগুলো নষ্ট হতে শুরু করে।
- ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের আকার সংকুচিত হয়ে যায়।
- সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, চেনা পথ হারিয়ে ফেলা, সঠিক শব্দ চয়ন করতে না পারা এবং হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দেয়।
- স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটলেও এই ঝুঁকি বাড়ে।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান: একবিংশ শতাব্দীর বড় স্বাস্থ্য সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বিশ্বজুড়ে গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই রোগ মহামারি আকার ধারণ করছে।
- বিশ্ব জুড়ে আক্রান্ত: প্রায় ৬ কোটি মানুষ।
- ভারতে আক্রান্ত: প্রায় ৮৮ লক্ষ।
- আক্রান্তের হার: প্রতি ৩.২ সেকেন্ডে ১ জন নতুন ব্যক্তি এতে আক্রান্ত হচ্ছেন (বছরে প্রায় ১ কোটি)।
- ভবিষ্যৎ আশঙ্কা: সঠিক পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ কোটিতে পৌঁছতে পারে।
রোগীর সঙ্গে পরিবারের লড়াই: কেয়ারগিভারদের ৫টি প্রধান চ্যালেঞ্জ
অ্যালঝাইমার্স কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো পরিবারকেই মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়।
১. প্রিয়জনের অচেনা রূপ: পরম প্রিয় বাবা, মা বা জীবনসঙ্গী যখন নিজের সন্তান বা সঙ্গীকে চিনতে পারেন না, তখন কেয়ারগিভারদের মানসিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ২. নিরাপত্তার ঝুঁকি: স্থান-কালের জ্ঞান হারিয়ে রোগীরা অনেক সময় একা রাস্তায় বেরিয়ে পথ হারান, কিংবা গ্যাস বা ধারালো জিনিস ব্যবহার করে দুর্ঘটনা ঘটান। ফলে ২৪ ঘণ্টা পাহারায় রাখতে হয়। ৩. সানডাউনিং সিন্ড্রোম (Sundowning Syndrome): বিকেল বা সন্ধ্যা নামলেই রোগীর মধ্যে অস্বাভাবিক অস্থিরতা, রাগ, ভয় ও চিৎকার করার প্রবণতা বাড়ে। রাতের পর রাত ঘুম না হওয়ায় কেয়ারগিভাররাও শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ৪. একই কথার পুনরাবৃত্তি: একই প্রশ্ন দিনে বহুবার করা বা খাওয়ার পরপরই ‘খেতে দেওয়া হয়নি’ বলে দাবি করা—এই পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে রাখা এক বিরাট পরীক্ষা। ৫. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও কেয়ারগিভার বার্নআউট: রোগের জটিলতার কারণে অনেক পরিবার সামাজিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। টানা সেবা করতে করতে কেয়ারগিভাররা নিজেরাও চরম বিষণ্ণতা ও ক্লান্তিতে আক্রান্ত হন।
কীভাবে সামলাবেন? চিকিৎসকের পরামর্শ ও সচেতনতা
প্রখ্যাত মনোবিদ ডাঃ জয়রঞ্জন রাম এবং বিশিষ্ট সঞ্চালক মীর আফসার আলি (যাঁরা নিজেরাও এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি) জানান, এই রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের সুনির্দিষ্ট ওষুধ এখনও নেই। তবে ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে রোগের গতি শ্লথ করা সম্ভব।
- সহানুভূতির স্পর্শ: আক্রান্ত রোগীকে জোর করে বোঝাতে যাবেন না যে তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। তাঁদের সঙ্গে তর্ক না করে ধৈর্য ও ভালোবাসা দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি: লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় চিহ্নিত করতে পারলে রোগীকে তুলনামূলকভাবে দীর্ঘকাল স্বাভাবিক জীবনে রাখা সম্ভব।