কালীঘাটে কালীপুজোয় কেন হয় মহালক্ষ্মীর আরাধনা? শতবর্ষের গোপন রহস্য জানলে চমকে যাবেন!

কালীঘাটে কালীপুজোর অনন্য রীতি: সন্ধ্যায় মহালক্ষ্মী আরাধনা, রাতে মায়ের নিশিপুজো
নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: কলকাতার ঐতিহাসিক কালীঘাট মন্দিরে কালীপুজোর দিন পালিত হয় এক বিরল ও ঐতিহ্যবাহী পরম্পরা। এই বিশেষ দিনে দেবী কালীর দুই ভিন্ন রূপের আরাধনার সাক্ষী থাকেন ভক্তরা। যেখানে সন্ধ্যায় মা কালীকে ‘মহালক্ষ্মী’ রূপে পূজা করা হয়, সেখানে গভীর অমাবস্যার নিশীথে শাস্ত্রীয় মতে সম্পন্ন হয় কালীরূপের নিশিপুজো।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ও মাহাত্ম্য
৫১ শক্তিপীঠের অন্যতম এই তীর্থস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন লোকবিশ্বাস। পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, এখানে সতীর ডান পায়ের আঙুল পতিত হয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮০৯ সালে বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয়। কালীঘাট শুধুমাত্র স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, এটি ভক্তদের কাছে গভীর বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু।
অলক্ষ্মী বিদায় ও মহালক্ষ্মীর আবাহন
মন্দিরের সেবাইতদের মতে, সারা বছরের অশুভ শক্তি ও অন্ধকার দূর করে নতুন আলোর দিশা পেতে কালীপুজোর সন্ধ্যায় মহালক্ষ্মী পূজার আয়োজন করা হয়। এই বিশেষ আচারের নিয়মগুলি নিম্নরূপ:
- অলক্ষ্মী বিদায়: সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ সেবাইতরা হাতে প্যাকাটি নিয়ে তিনবার মন্দির প্রদক্ষিণ করেন, যা অলক্ষ্মীকে বিদায় জানানোর প্রতীক।
- মহালক্ষ্মী রূপে সাজ: এরপর নাড়ু, মিষ্টান্ন, নতুন শাড়ি ও সুগন্ধি দিয়ে দেবীকে মহালক্ষ্মী রূপে সজ্জিত করা হয়। এই সময়ে মন্দির কিছুক্ষণের জন্য দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়।
- বিশেষ ভোগ: দিনের ভোগে খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা ও মাছের পাশাপাশি পিঁয়াজ-রসুনবর্জিত বলির মাংসের ভোগ নিবেদন করা হয়।
নিশিপুজো ও ঐতিহ্যবাহী নৈবেদ্য
সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর রাতে সম্পন্ন হয় মায়ের নিশিপুজো। মায়ের শয়ন প্রক্রিয়ার সময় ঐতিহ্য মেনে মন্দিরের অদূরে অবস্থিত ‘হরেন ময়রা’র বিখ্যাত ক্ষীরমোহন (চ্যাপ্টা রসগোল্লা) নিবেদন করা হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই মিষ্টি মায়ের সেবার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কালীপুজোর দিনের সময়সূচি:
- ভোর ৪:০০টা: ভক্তদের জন্য মন্দির উন্মুক্ত।
- দুপুর: মধ্যাহ্ন ভোগের সময় সাময়িক বিরতি। দুপুরের ভোগে থাকে পোলাও, সাদা ভাত, পাঁচ রকমের মাছ ও মাংস।
- সন্ধ্যা: মহালক্ষ্মী পুজো।
- গভীর রাত: দেবীর নিশিপুজো।
- রাত ৩:০০টা: মায়ের শয়ন সম্পন্ন হওয়ার পর মন্দির প্রাঙ্গণ বন্ধ করা হবে।
একই দিনে অশুভকে বিনাশ করে শুভ শক্তির আবাহনের এই অনন্য রীতি দেখতে প্রতি বছর কালীঘাটে ভিড় জমান অগণিত ভক্ত। প্রথা ও আভিজাত্যের মিশেলে কালীঘাটের কালীপুজো আজও কলকাতার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক।