শ্বাস নিলেই শরীরে ঢুকছে বিষ, অজান্তেই কোন মারণরোগের ফাঁদে পা দিচ্ছেন আপনি?

কলকাতার বাতাসে বিপৎসীমা পার দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী
নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা: শহরের বাতাসে দূষণের মাত্রা বিপদসীমা ছাড়িয়েছে। পরিবেশ ও তথ্যভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘একিউআই ডট ইন’ (aqi.in)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে কলকাতার গড় বায়ু গুণমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ১৯৬-এর কাছাকাছি। শহরের বাতাসে ধূলিকণার আধিক্য জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাতাসে PM2.5-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১১৮ মাইক্রোগ্রাম এবং PM10-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১০৫ মাইক্রোগ্রাম। ভারতের জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী, বাতাসে PM2.5 এবং PM10-এর নিরাপদ মাত্রা যথাক্রমে ৬০ ও ১০০ মাইক্রোগ্রাম হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ, এই মুহূর্তে বাতাসে ভাসমান অতিসূক্ষ্ম কণার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, সামনে কালীপুজো এবং শীতের তীব্রতা বাড়লে বায়ুদূষণের এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর প্রভাব:
পালমোনোলজিস্ট ডা. অরূপ হালদারের মতে, শীতকালীন ‘টেম্পারেচার ইনভার্সন’ বা তাপমাত্রার বিপরীত অবস্থার কারণে দূষণ ঘনীভূত হয়। PM2.5 সরাসরি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে সিওপিডি (COPD) ও হাঁজল রোগীদের ক্ষেত্রে বারবার ‘লাং অ্যাটাক’ বা ফুসফুসের অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা প্রাণঘাতী হতে পারে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও এই দূষণ ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়ার মতো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
হার্ট, চোখ ও ত্বকে বিপর্যয়:
দূষণের প্রভাব পড়ছে শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গেও:
- হৃদরোগ: কার্ডিওলজিস্ট ডা. সৌমিক চৌধুরীর মতে, সূক্ষ্ম ধূলিকণা রক্তে জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায় এবং রক্তনালী শক্ত করে দেয়, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে তোলে।
- চক্ষু সমস্যা: ডা. অনিন্দ্য কিশোর মজুমদার জানান, দূষণের কারণে কনজাংটিভাইটিস, ড্রাই আইজ ও চোখের প্রদাহের পাশাপাশি গ্লকোমা ও রেটিনোপ্যাথির মতো জটিলতা বাড়ছে। গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্বের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
- ত্বক ও চুল: চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মধুমিতা ভট্টাচার্যের মতে, দূষণের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ত্বকের সুরক্ষা কবচ নষ্ট করছে, যার ফলে অকাল বার্ধক্য, ব্রণের প্রকোপ ও চুল পড়ার সমস্যা বাড়ছে।
সুরক্ষায় চিকিৎসকদের পরামর্শ:
এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের জন্য বেশ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা:
১. বাইরে বেরোলে অবশ্যই N95 মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
২. খুব ভোরে প্রাতঃভ্রমণে না গিয়ে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করা শ্রেয়।
৩. ফ্লু ও নিউমোনিয়ার টিকা সময়মতো নেওয়া জরুরি। ক্রনিক রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইনহেলার বা ওষুধ বন্ধ করবেন না।
৪. প্রয়োজনবোধে ঘরে ভালো মানের এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এসি ও পাখা একসঙ্গে চালিয়ে শোয়ার অভ্যাস বর্জনীয়।