১৬-য় বিয়েই কি কাল হলো? দিদি লতার সঙ্গে আশা ভোঁসলের আজীবন টানাপড়েনের আসল কারণ কী?

ভারতীয় সংগীত জগতের দুই ধ্রুবতারা লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলে। তাঁদের সুরের জাদুতে কয়েক দশক বুঁদ হয়ে আছে বিশ্ব। তবে সাফল্যের সমান্তরালে এই দুই বোনের সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। পেশাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাকি পারিবারিক কলহ— ঠিক কী কারণে তাঁদের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিয়ে আজও চর্চা হয়। সম্প্রতি সামনে আসা বিভিন্ন তথ্য ও সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁদের সম্পর্কের এক জটিল সমীকরণ, যার কেন্দ্রে ছিল আশার জীবনের একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।
১৬ বছরের সেই বিয়ে ও পারিবারিক ভাঙন
লতা ও আশার সম্পর্কের টানাপোড়েনের মূল সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। তখন আশা ভোঁসলের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। পরিবারের অমতে তিনি বয়সে অনেক বড় গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল ও দায়িত্বশীল। বাবার অকালপ্রয়াণের পর ভাইবোনদের আগলে রাখাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। ছোট বোনের এই অপরিণত সিদ্ধান্ত তিনি সহজে মেনে নিতে পারেননি। এই বিয়ে মঙ্গেশকর পরিবারে যে ফাটল তৈরি করেছিল, তার রেশ ছিল দীর্ঘস্থায়ী।
গণপতরাও ভোঁসলে ও দুই বোনের দূরত্ব
লতা মঙ্গেশকর এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অন্যতম কারণ ছিলেন আশার প্রথম স্বামী গণপতরাও। অভিযোগ রয়েছে, লতার জনপ্রিয়তাকে নিজের ক্যারিয়ারের পথে বাধা মনে করতেন গণপতরাও। এমনকি তিনি আশাকে তাঁর পৈতৃক পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও নিষেধ করেছিলেন। এই কারণে দীর্ঘ সময় দুই বোনের মধ্যে মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ ছিল। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে যখন লতা খ্যাতির শীর্ষে, তখন আশা ভোঁসলেকে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি গড়তে একাই কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাকি ষড়যন্ত্রের গল্প
সংগীত মহলে গুঞ্জন ছিল, লতা ও আশা একে অপরের কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে আশা ভোঁসলে এই জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে বাইরের মানুষ ফাটল ধরার চেষ্টা করত। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাজ করার সময় অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে আশাকে এড়িয়ে চলতেন যেন তাঁরা লতার ঘনিষ্ঠ হতে পারেন। মজার বিষয় হলো, এসব ঘটনা নিয়ে দুই বোন আড়ালে হাসিঠাট্টাও করতেন। লতা মঙ্গেশকর নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে, আশা গানের এমন এক বিশেষ ধারা (Versatility) তৈরি করেছিলেন যা তাঁর নিজের পক্ষেও সম্ভব ছিল না।
রক্তের টানে ফের ফেরা
ব্যক্তিগত মান-অভিমান থাকলেও রক্তের সম্পর্ক সবসময়ই সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকেছে। লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে একসঙ্গে উপহার দিয়েছেন অজস্র কালজয়ী গান। ‘মন কিউ বেহকা রে বেহকা’ বা ‘কেয়া হুয়া ইয়ে মুঝে’র মতো গানগুলো তাঁদের পেশাদার রসায়নেরই প্রমাণ দেয়। লতার শেষ জীবনেও আশা ছিলেন তাঁর পাশে। ছোটবেলার সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আশা বহুবার বলেছেন, দিদিই তাঁকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন এবং লতাই তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ শিল্পী।
একঝলকে
- আশা ভোঁসলের ১৬ বছর বয়সে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ের সিদ্ধান্ত পরিবারের অশান্তির মূল কারণ ছিল।
- লতা মঙ্গেশকরের মতে, আশার প্রথম স্বামী তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছিলেন।
- পেশাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে পারিবারিক জেদ ও ভুল বোঝাবুঝিতেই দূরত্ব বাড়ে।
- লতা স্বীকার করেছিলেন যে, আশার গায়কীর বিশেষ শৈলী তাঁর আয়ত্তের বাইরে ছিল।
- ব্যক্তিগত বিবাদ থাকলেও বহু কালজয়ী গানে দুই বোন একসাথে কণ্ঠ দিয়েছেন।