অষ্টম শ্রেণির ছাত্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’! ১০ ঘণ্টার ডিজিটাল অ্যারেস্ট থেকে বাবা-মাকে বাঁচাল খুদে তনয়

উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষী থাকল গোটা দেশ। সাইবার অপরাধীদের পাতা ফাঁদ থেকে নিজের পরিবার ও কষ্টার্জিত অর্থ বাঁচাতে ঢাল হয়ে দাঁড়াল মাত্র ১৩ বছরের এক কিশোর। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তন্ময়ের অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার কারণে ১০ ঘণ্টার ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ থেকে মুক্তি পেল তার বাবা-মা, রক্ষা পেল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা ৬ লাখেরও বেশি টাকা।
যেভাবে শুরু হয়েছিল এই ডিজিটাল নাটক
ঘটনাটি ঘটে গত ৬ এপ্রিল বেরিলির প্রেম নগর এলাকায়। সঞ্জয় কুমার ও তাঁর স্ত্রী রোশনি সাক্সেনার কাছে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ভিডিও কল আসে। ফোনের ওপাশে পুলিশের পোশাকে থাকা এক ব্যক্তি নিজেকে এটিএস (ATS) অফিসার হিসেবে পরিচয় দেয়। অপরাধীরা দাবি করে, রোশনি সাক্সেনার নামে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাঁর তথ্যের মাধ্যমে দেশের গোপনীয়তা ফাঁস হচ্ছে। ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন দম্পতি।
১০ ঘণ্টার গৃহবন্দি দশা
সাইবার প্রতারকরা দম্পতিকে মানসিকভাবে এমনভাবে ভেঙে দেয় যে তারা নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পিন, প্যান কার্ড এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের হাতে তুলে দেন। এরপর শুরু হয় তথাকথিত ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। অপরাধীরা নির্দেশ দেয়:
- তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির দরজা বন্ধ রাখতে হবে।
- কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে না।
- বাইরে বেরোলেই গ্রেফতার করা হবে।
এমনকি বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে একটি জাল অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টও পাঠানো হয় তাঁদের ফোনে। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা এভাবেই আতঙ্কের মধ্যে কাটে ওই পরিবারের।
খুদে মাস্টারমাইন্ডের পালটা চাল
সারা বাড়িতে যখন ভয়ের পরিবেশ, তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তন্ময় লক্ষ্য করছিল পুরো বিষয়টি। সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সে আগেই ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ সংক্রান্ত জালিয়াতি সম্পর্কে সচেতন ছিল। সে বুঝতে পারে তার বাবা-মা বড় কোনো বিপদে পড়েছেন।
তন্ময় অত্যন্ত কৌশলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেয়:
- অ্যাপ ডিলিট: অপরাধীরা নজরদারির জন্য ফোনে যে বিশেষ অ্যাপ ইনস্টল করিয়েছিল, তন্ময় বাবা-মায়ের অজান্তে সেগুলো ফোন থেকে ডিলিট করে দেয়।
- সাহসী সিদ্ধান্ত: অপরাধীদের নজর এড়িয়ে সে বাড়ি থেকে লুকিয়ে বেরিয়ে পড়ে এবং প্রতিবেশীদের সাহায্যে পুলিশকে খবর দেয়।
১০ মিনিটে বাজিমাত
তন্ময়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রেম নগর থানার পুলিশ ও সাইবার সেল বিদ্যুৎ গতিতে কাজ শুরু করে। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে সঞ্জয় কুমারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ বা লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই সময় অপরাধীরা অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় ৬ লাখের বেশি টাকা রক্ষা পায়।
পুরস্কার ও সচেতনতা
তন্ময়ের এই বীরত্ব দেখে মুগ্ধ বেরিলির এসএসপি অনুরাগ আর্য। তিনি সাইবার টিমকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি তন্ময়কে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ভারতে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ বলে কোনো আইনি প্রক্রিয়া নেই। কোনো পুলিশ বা সরকারি সংস্থা ভিডিও কলের মাধ্যমে কাউকে বন্দি করতে পারে না।
একঝলকে
- ঘটনা: ১০ ঘণ্টার ডিজিটাল অ্যারেস্ট থেকে উদ্ধার।
- নায়ক: ১৩ বছর বয়সী অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তন্ময়।
- স্থান: প্রেম নগর, বেরিলি (উত্তরপ্রদেশ)।
- উদ্ধারকৃত অর্থ: ৬ লাখ টাকার বেশি।
- পুলিশি বার্তা: ডিজিটাল অ্যারেস্ট একটি গুজব ও জালিয়াতি, এমন ফোন এলে সরাসরি পুলিশকে জানান।