আমেরিকা যুদ্ধ করছে, ইরানের ‘বন্ধু’ চিন কেন চুপ? ‘অন্য খেলা’ খেলছে বেজিং

আমেরিকা যুদ্ধ করছে, ইরানের ‘বন্ধু’ চিন কেন চুপ? ‘অন্য খেলা’ খেলছে বেজিং

ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধে চিনের রহস্যময় নীরবতা এবং বেজিংয়ের নেপথ্য কৌশল

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে বিধ্বংসী সংঘর্ষ চলছে এবং আমেরিকা সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, তখন তেহরানের দীর্ঘদিনের ‘বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত চিনের অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেছিলেন, চিন হয়তো ইরানের সবচেয়ে বড় সামরিক ঢাল হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে বেজিং বর্তমানে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি গ্রহণ করেছে, যা অনেককেই অবাক করেছে। যদিও গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি এবং ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই বন্ধুত্বের গভীরতা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

চিনের এই কৌশলী অবস্থানের নেপথ্যে মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা কাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালে চিন উপসাগরীয় দেশগুলোর বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠলেও ইরানে তাদের প্রকৃত বিনিয়োগের অঙ্ক তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। ২০২৩ সালে ইরানে চিনা বিনিয়োগ ছিল মাত্র ১৮৫ মিলিয়ন ডলার, যেখানে সৌদি আরবে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়ে রিয়াধ বা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিপন্ন করতে চাইছে না শি জিনপিং প্রশাসন। এমনকি ভেনিজুয়েলা বা আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও চিনকে একই রকমভাবে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে দেখা গিয়েছিল।

সামরিক ক্ষেত্রেও চিনের ভূমিকা অত্যন্ত সতর্ক। যুদ্ধের ঠিক আগে ইরান চিনের তৈরি বিধ্বংসী ‘CM302’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার প্রস্তুতি নিলেও এবং চিনা ওপেন সোর্স গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মার্কিন সামরিক গতিবিধির স্যাটেলাইট চিত্র শেয়ার করলেও, সরাসরি কোনো সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি বেজিং দেয়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রয়াণের পর চিনের মৃদু প্রতিক্রিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিংজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উইলিয়াম ফিগুয়েরোর মতে, ২৫ বছরের সেই বহুল আলোচিত চুক্তিটি আসলে ছিল নির্দিষ্ট আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা বিহীন একটি ভবিষ্যতের রূপরেখা মাত্র। চিন মূলত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মতো নিরাপত্তা বা সামরিক বাধ্যবাধকতা পালনে আগ্রহী নয়।

পরিশেষে, চিনের এই ‘অন্য খেলা’ আসলে তাদের নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের এক দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। তারা একদিকে ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে সুবিধা নিচ্ছে, আবার অন্যদিকে কোনো বড় ধরণের ঝুঁকিতে না গিয়ে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, চিন হয়তো ইরানের সম্পূর্ণ পতন চায় না, কিন্তু যুদ্ধের জেরে তৈরি হওয়া তেহরানের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে বড় কোনো ঋণদাতা বা সুবিধাবাদী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে দ্বিধাবোধ করবে না। অর্থাৎ, সামরিক লড়াইয়ের ময়দানে অনুপস্থিত থাকলেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চালদাবার খেলায় বেজিং নিজের অবস্থান সুনিশ্চিত করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *