একদিকে শান্তির ‘ভণ্ডামি’, অন্যদিকে ভারতের মাস্টারস্ট্রোক: বিশ্বরাজনীতির পিচে কোণঠাসা পাকিস্তান!

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে দুটি ভিন্ন মেরুর কূটনীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান যখন আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী সেজে বিশ্বমঞ্চে নিজের ভাবমূর্তি ফেরানোর চেষ্টায় ব্যস্ত, ভারত তখন অত্যন্ত কৌশলীভাবে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বলয়ে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন পিচ তৈরি করছে। দিল্লি বর্তমানে আজারবাইজান, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণ বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ‘রিসেট’ বাটন
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটাতে উদ্যোগী হয়েছে উভয় পক্ষই। বাংলাদেশে নতুন সংসদীয় নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর হিসেবে দিল্লিতে এসেছেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে তার দীর্ঘ বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করেছে। ইউনিস সরকারের আমলে বাংলাদেশের যে ঝুঁকে পড়া মনোভাব পাকিস্তানের দিকে দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সরকারের এই সফর সেই মেরুকরণকে অনেকটা প্রশমিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তুরস্ক ও আজারবাইজানের সঙ্গে বরফ গলছে
কাশ্মীর ইস্যুতে তুরস্কের কট্টর অবস্থান এবং পাকিস্তান ঘেঁষা আজারবাইজানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই তিক্ত। তবে অতি সম্প্রতি সেই স্থিতাবস্থায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চার বছর পর ভারত ও তুরস্কের মধ্যে ফরেন অফিস কনসালটেশনের (FoC) ১২তম রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক জড়তা কাটাতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মাঝে আটকে পড়া ২১৫ জন ভারতীয়কে নিরাপদে উদ্ধারে আজারবাইজান যে সহায়তা করেছে, তার জন্য ভারত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। অতীতে পাকিস্তানের সামরিক সমর্থন দেওয়ায় ভারতীয় পর্যটকরা আজারবাইজান বয়কটের ডাক দিলেও বর্তমান উদ্ধারকাজে সহযোগিতার ফলে সেই বৈরিতা কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্য
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আসন্ন ১১-১২ এপ্রিলের সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই সফরের মূল লক্ষ্য। ইউএই’র সঙ্গে ‘কমন স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ আরও গভীর করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চাইছে দিল্লি।
কেন এই কৌশলী পরিবর্তন?
পাকিস্তানের বর্তমান কৌশল হলো আন্তর্জাতিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা। এর বিপরীতে ভারতের লক্ষ্য হলো পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার করে তোলা। তুরস্ক ও আজারবাইজান যদি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিকভাবে যুক্ত হয়, তবে আন্তর্জাতিক ফোরামে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের একক আধিপত্য খর্ব হবে।
একঝলকে
- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন সরকারের অধীনে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক সংস্কারের উদ্যোগ।
- তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘ চার বছর পর কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু।
- ইরান সংকটকালে আটকে পড়া ভারতীয়দের উদ্ধারে আজারবাইজানের প্রত্যক্ষ সহায়তা।
- ইউএই সফরে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এস জয়শঙ্করের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
- পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রভাব কমাতে তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ভারতীয় কৌশল।