এলপিজির পর এবার সিএনজি ও পিএনজি সংকট ইরান কর্তৃক কাতারের এলএনজি ট্যাঙ্কার আটক

এলপিজি সিলিন্ডারের আকাশছোঁয়া দাম ও তীব্র সংকটের পর এবার দেশে সিএনজি ও পিএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আমেরিকা, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ‘স্ট্রেট অফ হরমুজ’। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইরান কাতারের দুটি এলএনজি ট্যাঙ্কারকে সমুদ্রপথে মাঝপথে আটকে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের রিভোল্যুশনারি গার্ডস হরমুজ প্রণালীতে কাতারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি ট্যাঙ্কারকে গতিরোধ করে থামিয়ে দিয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই জাহাজ দুটিকে বর্তমান অবস্থানেই দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও গত সপ্তাহে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী এই ট্যাঙ্কার দুটির যাওয়ার কথা ছিল। শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, ‘আল দায়েন’ এবং ‘রশিদা’ নামের জাহাজ দুটি সোমবার পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহি উপকূলে অবস্থান করছিল।
বিশ্বের মোট এলএনজি এবং খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের জেরে এই বাণিজ্যিক পথটি এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, কাতার এনার্জির মালিকানাধীন ওই দুটি ট্যাঙ্কার প্রথমে চীন ও পাকিস্তানের দিকে রওনা দিলেও পরে দিক পরিবর্তন করে পুনরায় কাতারের দিকে ফিরে যাওয়ার সঙ্কেত দিয়েছে। এতে প্রমাণিত হচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা সরাসরি জ্বালানি রফতানিতে প্রভাব ফেলছে।
ভারতের ওপর এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। কাতার ভারতের বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ হলেও যুদ্ধের কারণে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তারা রফতানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে ভারতের এলএনজি টার্মিনালগুলোতে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। যদিও ইরান ভারতকে ‘বন্ধু দেশ’ হিসেবে গণ্য করে তাদের জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু কাতারের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় সেই সুযোগ খুব একটা কাজে আসছে না।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার ‘ন্যাচারাল গ্যাস (সাপ্লাই রেগুলেশন) অর্ডার ২০২৬’ জারি করেছে। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, ঘরোয়া রান্নার গ্যাস (পিএনজি) এবং যানবাহনের জ্বালানিকে (সিএনজি) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ১০০ শতাংশ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে শিল্পক্ষেত্র ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে কাটছাঁট করা হচ্ছে। গুজরাট গ্যাস এবং জিএসপিসি-র মতো সংস্থাগুলো ইতিমধ্য়েই শিল্পক্ষেত্রে সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত সেক্টরগুলোতেও জ্বালানি সংকট তীব্র হতে পারে। ভারতের প্রয়োজনীয় এলএনজি-র সিংহভাগ আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং স্টোরেজ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। যদি হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা কাটানো না যায়, তবে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে গণপরিবহন—সর্বত্রই সিএনজি ও পিএনজির হাহাকার দেখা দিতে পারে।