ওটি-র থেকেও স্বচ্ছ বাতাস আর এক চুল ভুলেই সব শেষ! চিপ তৈরির এই রহস্যময় ঘরটি না থাকলে থমকে যাবে গোটা পৃথিবী

আজকের আধুনিক বিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে আঙুলের ডগা সমান এক টুকরো সিলিকন বা সেমিকন্ডাক্টর চিপের ওপর। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মহাকাশযান, এটিএম মেশিন থেকে জীবনদায়ী চিকিৎসা সরঞ্জাম— সবকিছুর ‘প্রাণভোমরা’ এই খুদে চিপ। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই চিপ যেখানে তৈরি করা হয়, সেই জায়গাটি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের (OT) চেয়েও কয়েক গুণ বেশি পরিষ্কার? বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্লিনরুম’। আর এই ক্লিনরুমের সামান্যতম ত্রুটি মানেই আধুনিক সভ্যতার চাকা থমকে যাওয়া।
কেন ক্লিনরুম এত জরুরি?
সেমিকন্ডাক্টর চিপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। চিপ তৈরির প্রক্রিয়া এতটাই জটিল যে, বাতাসের একটি অতি ক্ষুদ্র ধূলিকণা কিংবা মানুষের মাথার একটি সূক্ষ্ম চুলও যদি এর সংস্পর্শে আসে, তবে পুরো চিপটি অকেজো হয়ে যেতে পারে। যদি চিপ তৈরির সময় সঠিক পরিবেশ বজায় না থাকে, তবে তার স্থায়ীত্ব কমে যাবে। আর যদি বিশ্বজুড়ে চিপ সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় বা চিপগুলো দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে, তবে অচল হয়ে পড়বে আপনার ফোন, গাড়ি এবং সমস্ত ডিজিটাল পরিষেবা।
গুজরাটের সাণন্দে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্লিনরুম
ভারত এখন চিপ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। মোদী সরকারের বিশেষ গুরুত্বে গুজরাটের সাণন্দে ‘মাইক্রন’ (Micron) কো ম্পা নি গড়ে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্লিনরুম। এই প্রজেক্টের বিশালতা বোঝাতে মাইক্রন টেকনোলজির সিইও সঞ্জয় মেহরোত্রা এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, ৫ লক্ষ বর্গফুট জুড়ে বিস্তৃত এই ক্লিনরুম তৈরিতে আইফেল টাওয়ারের চেয়ে সাড়ে তিন গুণ বেশি লোহা এবং ১০০টি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল বানাতে যতটা কংক্রিট লাগে, ততটা ব্যবহার করা হয়েছে।
অপারেশন থিয়েটারের চেয়েও শুদ্ধ বাতাস
ক্লিনরুমের ভেতরের পরিবেশকে বলা হয় ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’। এখানে বাতাসের মান বজায় রাখতে ওপর থেকে নিচে লম্বালম্বিভাবে (Vertically) ফিল্টার করা হাওয়া প্রবাহিত করা হয়। কোনো রকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এই হাওয়া এক লয়ে বয়ে চলে। এই ঘরের মেঝে মূল মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে তৈরি করা হয়, যার নিচ দিয়ে সার্বক্ষণিক কুলিং, পাওয়ার এবং ডেটা ক্যাবলিংয়ের কাজ চলে। এর বিশুদ্ধতা হাসপাতালের ওটি-কেও হার মানায়।
এক ডিগ্রি তাপমাত্রার হেরফের মানেই মহাবিপদ
চিপ তৈরির মেশিনগুলো বা মেমরি টেস্টার থেকে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। এই ক্লিনরুমে তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও এদিক-ওদিক হয়, তবে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই এখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয় অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্তরে। এমনকি বিদ্যুৎ বা কুলিং সিস্টেম যাতে এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ না হয়, তার জন্য রাখা হয়েছে শক্তিশালী ব্যাকআপ ব্যবস্থা।
ভারতের নতুন দিশা
সেমিকন্ডাক্টর সেক্টরে ভারত এখন এক শক্তিশালী দাবিদার। ২০১৯ সাল থেকে ভারতে কাজ করা এই সংস্থাটি বেঙ্গালুরু এবং হায়দ্রাবাদে তাদের রিসার্চ সেন্টার চালাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের প্রায় ২৪ হাজার মানুষ এই উচ্চপ্রযুক্তির কাজে যুক্ত। ভারতের মাটিতে তৈরি এই ক্লিনরুম কেবল চিপ বানাবে না, বরং বিশ্বজুড়ে ভারতের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
ভারতের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি চিপ আগামী দিনে বিশ্ববাজারের মেমরি এবং প্রসেসর প্রযুক্তির চালিকাশক্তি হতে চলেছে।