জলবায়ু পরিবর্তন কি গিলে খাবে ইতিহাস? মহাপ্রাচীর থেকে পিরামিড—ধ্বংসের মুখে বিশ্ব ঐতিহ্য

জলবায়ু পরিবর্তন কি গিলে খাবে ইতিহাস? মহাপ্রাচীর থেকে পিরামিড—ধ্বংসের মুখে বিশ্ব ঐতিহ্য

প্রকৃতি ও মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশ্বের প্রাচীন স্থাপত্যগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে। আগে যুদ্ধ বা সংঘাত ইতিহাসের নিদর্শনে বড় আঘাত হানলেও বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ভিলেন হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বৈশ্বিক ঐতিহ্য এখন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা হাজার বছরের পুরনো পাথর ও মাটির স্থাপত্যগুলোকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

ঝুঁকির মুখে মেসোপটেমীয় সভ্যতা ও উরের জিগুরাত

ইরাকের ৪,০০০ বছরের পুরনো চন্দ্র দেবতা নন্নুর মন্দির ‘উরের জিগুরাত’ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মরুভূমির উত্তপ্ত আবহাওয়া এবং তীব্র ধূলিঝড় মন্দিরটির উত্তরাংশকে প্রতিনিয়ত ক্ষয় করছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ জলর লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় মাটির তৈরি প্রাচীন এই স্থাপত্যের ভিত্তি আলগা হয়ে যাচ্ছে। লবণাক্ত জল ইটের ভেতরে প্রবেশ করে ক্রিস্টাল তৈরি করছে, যার ফলে ভেঙে পড়ছে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার এই অমূল্য নিদর্শন। শুধু উর নয়, ব্যাবিলন শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও একই কারণে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

ধ্বংসের পথে ইরানের স্থাপত্যশৈলী ও মসজিদের শহর ইসফাহান

ইরানের স্থাপত্যকলার জাদুঘর বলা হয় ইসফাহান শহরকে। ১২ শতকের পুরনো ‘মসজিদ-এ জামে’ এবং ১৭ শতকের নীল গম্বুজের ‘ইমাম মসজিদ’ এখন মারাত্মক হুমকির মুখে। দীর্ঘমেয়াদী খরা এবং ভূগর্ভস্থ জলরস্তর নিচে নেমে যাওয়ায় শহরের মাটি দেবে যাচ্ছে। এর ফলে প্রাচীন এই মসজিদগুলোর দেয়ালে বিশাল বিশাল ফাটল দেখা দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে ইরানি স্থাপত্যের এই অনন্য নিদর্শনগুলো।

জলর নিচে চলে যেতে পারে ইস্টার আইল্যান্ডের মোআই মূর্তি

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা ইস্টার আইল্যান্ডের সেই রহস্যময় ৮০০ বছরের পুরনো ‘মোআই’ মূর্তিগুলো আগামী ৫০ বছরের মধ্যে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বেড়েছে। এতে অন্তত ৫১টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সরাসরি প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা দ্বীপটির পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করবে।

ক্ষয়িষ্ণু মহাপ্রাচীর: চীনের গর্ব কি বিলীন হবে

প্রায় ২১,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চীনের মহাপ্রাচীরও রক্ষা পাচ্ছে না প্রকৃতির রোষ থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মহাপ্রাচীরের মাত্র ৬ শতাংশ এখন পুরোপুরি নিরাপদ। বাকি ৫২ শতাংশ হয় ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা ধ্বংসের পথে। মূলত ভিজে মাটি ও চুনাপাথরের মিশ্রণে তৈরি এই প্রাচীরটি চরম তাপমাত্রা এবং ঝড়ো বৃষ্টির ফলে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। প্রাচীরের গায়ে ফাটল ধরা ও ধসে পড়া এখন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একঝলকে

  • জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ৮০ শতাংশ ঐতিহ্যবাহী স্থান হুমকির মুখে।
  • লবণাক্ততার কারণে ইরাকের ৪,০০০ বছরের পুরনো জিগুরাত মন্দির ভেঙে পড়ছে।
  • ভূগর্ভস্থ জল হ্রাসে ইরানের ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতে ফাটল দেখা দিয়েছে।
  • সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধিতে আগামী ৫০ বছরে ডুবে যেতে পারে ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তি।
  • চীনের মহাপ্রাচীরের মাত্র ৬ শতাংশ অংশ বর্তমানে অক্ষত রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *