জিতলে রাজা, হারলে সন্ন্যাস! বিমল গুরুংয়ের ‘মরণ-বাঁচন’ লড়াই কি পাহাড়ের ভাগ্য বদলাবে?

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন পাহাড়ের রাজনীতিতে এক নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি রাজনীতিতে এক সময়ের অবিসংবাদিত নেতা বিমল গুরুং এখন নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার শেষ লড়াইয়ে অবতীর্ণ। দার্জিলিংয়ের ম্যালের চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা সুপ্রিমো বিমল গুরুং যে ঘোষণা করেছেন, তাতে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তাঁর সাফ কথা, দার্জিলিং আসনে বিজেপি প্রার্থী নমন রাই জয়ী না হলে তিনি চিরতরে রাজনীতি থেকে বিদায় নেবেন।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও রাজনৈতিক সমীকরণ
বিমল গুরুং নিজে এই নির্বাচনে প্রার্থী না হলেও, বিজেপি প্রার্থী নমন রাইয়ের জয় নিশ্চিত করা তাঁর কাছে সম্মানের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সমীকরণ গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী রাজু বিস্তার জয়ে বিমলের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু এবার নিজের দাপট বজায় রাখতে এবং জিএনএলএফ-এর মতো বিরোধী পক্ষকে কোণঠাসা করতে তিনি বিজেপির প্রতীকে নিজের দলের যুব নেতা নমন রাইকে লড়াইয়ের ময়দানে নামিয়েছেন।
বারবার অবস্থান পরিবর্তন ও পাহাড়ের জনমত
বিমল গুরুংয়ের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন সময়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। ২০১৭ সালের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন, দীর্ঘ সময় আত্মগোপন, এরপর নাটকীয়ভাবে কলকাতায় উপস্থিত হয়ে তৃণমূলের হাত ধরা—এই সবকিছুই পাহাড়ের রাজনীতিতে তাঁর ভাবমূর্তিকে কিছুটা বিতর্কিত করেছে। পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন যে তৃণমূলের সাথে থাকা তাঁর পাহাড়ের জনভিত্তিকে দুর্বল করছে। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি পুনরায় বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
আবেগ বনাম বাস্তবতা
বিমল গুরুংয়ের ‘রাজনীতি সন্ন্যাসের’ হুমকি কি সত্যিই কোনো মাস্টারস্ট্রোক নাকি হারানো জমি ফিরে পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অতীতেও তিনি একাধিকবার চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে পিছু হটেছেন। ২০০৮ সালে তিনি বলেছিলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গোর্খাল্যান্ড না এলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। গোর্খাল্যান্ড আসেনি, আর বিমলও তাঁর ঘোষণা থেকে সরে এসেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারও তিনি পাহাড়বাসীর আবেগ উসকে দিয়ে ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছেন।
তবে এবারের লড়াই বিমলের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। বিজেপি প্রার্থী নমন রাই পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের স্বপ্ন দেখালেও, পাহাড়ের মানুষ শেষ পর্যন্ত বিমল গুরুংয়ের এই ‘শেষ সুযোগে’ সাড়া দেবেন কি না, তা কেবল ভোটের ফলাফলই বলতে পারবে।
একঝলকে
- দার্জিলিং আসনে বিজেপি প্রার্থী নমন রাইয়ের হয়ে প্রচারে নেমেছেন বিমল গুরুং।
- প্রার্থী না জিতলে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
- জিএনএলএফ-কে কোণঠাসা করে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনে মরিয়া গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা প্রধান।
- অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস ভাবমূর্তিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
- পাহাড়ের জনতা এই আবেগী কার্ডে সাড়া দেয় কি না, তার ওপর নির্ভর করছে বিমলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।