ট্রাম্পের পিছুটান ও মধ্যপ্রাচ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকির মাত্র এক দিন পরই আলোচনার টেবিলে বসার এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীকে অবাক করেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের দেওয়া ‘দশ দফা পরিকল্পনা’কে কার্যকর ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনবে নাকি এটি কেবল ঝড়ের আগের পূর্বাভাস, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
দ্বিমুখী বিজয় দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতি
২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বেসামরিক মানুষ যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে ছিল, এই যুদ্ধবিরতি তাদের জন্য সাময়িক স্বস্তি বয়ে এনেছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে দু’পক্ষই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করছে:
- যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘ঐতিহাসিক ও অপ্রতিরোধ্য সামরিক বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, ইরান নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েই আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছে।
- ইরানের অবস্থান: তেহরান এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের প্রতিরোধের ফসল হিসেবে দেখছে। ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ একে ‘ইরানের যুগ শুরু হওয়া’ এবং বিশ্ব ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রের উত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আলোচনার টেবিলে কঠিন শর্তাবলি
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান যে দশ দফা দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। এই শর্তগুলোর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো:
- হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
- যুদ্ধজনিত কারণে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
- বিদেশে জব্দ করা ইরানের সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পদ অবমুক্ত করা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরুতে ইরানে শাসন পরিবর্তনের ডাক দিলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। যে প্রশাসনকে উৎখাতের কথা বলা হয়েছিল, তাদের সাথেই এখন পূর্ণ অংশীদার হিসেবে আলোচনা করতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি ইরানের জন্য কৌশলগত চাপের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি জাহাজকে ইরানের সামরিক বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে চলতে হবে। এমনকি তারা সুয়েজ খালের মতো এই পথেও চলাচলের জন্য ‘টোল’ বা ফি দাবি করতে পারে। এটি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রভাব
এই যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া এবং আসন্ন ইসলামাবাদ আলোচনায় চীনের সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য এবং মিত্র দেশগুলোর প্রতি অবজ্ঞাসূচক আচরণের ফলে নেটো জোট এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ফাটল আরও স্পষ্ট হয়েছে।
লেবাননের জনগণকে এই যুদ্ধবিরতির আওতাভুক্ত না করায় এবং সেখানে ইসরায়েলের অব্যাহত বিমান হামলা এই সমঝোতাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে এই সাময়িক শান্তি পুনরায় মহাযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।